জুয়া খেলায় ১০০ টাকা হেরে এক যুগ নিরুদ্দেশ

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ১১:২৭ পিএম

জুয়া খেলায় ১০০ টাকা হেরে মোবাইল খোয়ান সুমন। এই ভয়ে সে আর বাবা-মায়ের কাছে কাছে ফেরেনি। তখন বয়স ছিল ১৬ বছর। এরপর শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। কখনো বায়তুল মোকাররম মসজিদের বারান্দায়, কখনো ফুটপাতে রাত কাটে। শুরু হয় তার কর্মজীবনের নানা কাহিনি। কখনো বাস হেলপার, কখনো ফুলের মার্কেটে কাজ, হোটেলের বাবুর্চির কাজ করতেন।

এইভাবে ১২ বছর ঘর ছেড়ে সুমন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। ভ্যানে করে রুমা অ্যাকুয়ারিয়াম সেন্টার, পপুলার অ্যাকুয়ারিয়াম সেন্টার ঘুরে ইউসেফ টেকনিক্যাল স্কুল ও বারডেম হাসপাতালে যাত্রী আনা-নেয়ার কাজও করত।

ইউসেফ স্কুলের এক ছাত্রীর মায়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান সুমন। আগের স্বামীকে তালাক দিয়ে সুমনকে বিয়ে করেন ওই ছাত্রীর মা। চার বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের ঘর আলো করে একটি ছেলে সন্তান হয়। স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে রায়েরবাগ এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে আসছিলেন।

তার সন্ধানে বাবা মোজাফফর হোসেন থানায় জিডি করেন। মামলাও করেন। তদন্ত ভার থানা, ডিবি, সিআইডির হাত বদলে সর্বশেষ আসে পিবিআইয়ের হাতে।

সোমবার রাতে রাজধানী কদমতলীর মদিনাবাগ এলাকা থেকে সুমনকে উদ্ধার করে পিবিআই।

মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁও ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের (ঢাকা মেট্রো-উত্তর) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় মিরপুর-১১ নম্বর বাজার এলাকায় জুয়া (তিনতাস) খেলায় বসেন সুমনসহ তার সহযোগীরা। সেখানে ১শ টাকার বাজি হেরে মোবাইলটি খোয়ান। মোবাইল খোয়ানোর ভয়ে সুমন আর পরিবারে ফেরেনি।

ওই দিন সকাল ৮টায় বাবা মোজাফ্ফর সুমনকে নিয়ে বাসা থেকে তার কর্মস্থল ডায়মন্ড প্যাকেজিং গার্মেন্টসে যান। কিন্তু গার্মেন্টস থেকে ফিরে দেখেন ছেলে সুমন বাসায় ফেরেনি। পরে মোজাফ্ফর ছেলের সন্ধান চেয়ে ওই বছর ৫ অক্টোবর পল্লবী থানায় একটি জিডি করেন। এরই মধ্যে বাবার কাছে তথ্য আসে সুলায়মান হোসেন, শাওন পারভেজ, রুবেল, সোহাগ ও মানিক মিলে সুমনকে অপহরণ করেছে। পরে তিনি ২০১০ সালের ২৯ অক্টোবর পল্লবী থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। তদন্তভার থানা, ডিবি, সিআইডির হাত বদলে সর্বশেষ আসে পিবিআইয়ের কাছে।

তিনি আরও বলেন, ১২ বছরে কেউ সন্ধান দিতে পারেনি তার। সুমনের স্ত্রীর সহযোগিতা আর পিবিআইয়ের লেগে থাকা তদন্তে দীর্ঘ ১২ বছর ঘরছাড়া সুমন ফিরে আসে পরিবারে।

পিবিআই তদন্তকালে জানতে পারে, নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর একটি মোবাইল নম্বর হতে বাদীর সঙ্গে কথা বলেন সুমন। ভিকটিমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়েই ফোনটি রেখে দেয়। এরপর থেকে মোবাইল নম্বরটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ওই মোবাইল নম্বরের মালিক শনাক্ত হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানান, তিনি মিরপুরের শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এরপর তিনি ডায়মন্ড প্যাকেজিংয়ে হেলপার হিসাবে কাজ করেন। ঘটনার দিন মিরপুর-১১ নম্বর বাজার এলাকার চার রাস্তার মোড়ে ৩ তাসের জুয়া খেলায় ১০০ টাকা ধরে হেরে যায়। কাছে টাকা না থাকায় তার কাছ থেকে জোরপূর্বক মোবাইল নিয়ে জুয়ারিরা রেখে দেয়। মোবাইলের বিষয়ে বাবাকে কি উত্তর দেবে, এই ভয়ে বাসায় না ফিরে মিরপুর থেকে গুলিস্তান যায়। সারাদিন গুলিস্তানে ঘোরাফেরা করে। রাতেও বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করে। পরদিন সকালে বায়তুল মোকাররম মসজিদে শুয়ে থাকেন।

তারপর থেকে কখনো রাত কাটে বায়তুল মোকাররম মসজিদের বারান্দায়, কখনো বাসে, কখনো ফুটপাতে থাকত সে। কখনো ফুলের মার্কেটে কাজ, বাসের হেলপার, হোটেলের বাবুর্চি, চটপটি কিংবা পপকর্নের ব্যবসায় ব্যস্ত সময় কাটান সুমন। রুমা অ্যাকুয়ারিয়াম সেন্টার, পপুলার অ্যাকুয়ারিয়াম সেন্টার ঘুরে ইউসেফ টেকনিক্যাল স্কুল ও বারডেম হাসপাতালের যাত্রী আনা নেয়া করত।

তিনি জানান, ইউসেফ স্কুলের এক ছাত্রীর মায়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। প্রায় ৪ বছর আগে স্বামীকে তালাক দিয়ে সুমনকে বিয়ে করেন ওই ছাত্রীর মা। এর মধ্যে তাদের একটি ছেলে সন্তান হয়। স্ত্রীকে নিয়ে রায়েরবাগ এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে আসছিলেন সুমন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত