ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষে উত্তপ্ত ঢাবি, আহত ৪০

আপডেট : ২৫ মে ২০২২, ০১:৫১ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুরো ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে অন্তত ৪০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ সময় ছাত্রদলের দুই কর্মীসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে এক সমাবেশে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করে একটি বক্তব্য দেন। এর জেরে ওইদিন সন্ধ্যায় টিএসসিতে ছাত্রদলের দুই নেতাকর্মীকে মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ হামলার প্রতিবাদ ও বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করতে যাওয়ার সময় গতকাল সকাল ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। পরে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়াপাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহীদুল্লাহ হলের সামনে ফের সংঘর্ষ হয়। দুদফা সংঘর্ষে অন্তত ৪০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি ছাত্রদলের।

ছাত্রদলের অভিযোগ, পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন করতে যাওয়ার পথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় তাদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। পরে বেলা ১১টার দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে ছাত্রলীগকে ধাওয়া দেয়। এ সময় দুইপক্ষই ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ঘণ্টাখানেক পর ক্যাম্পাস ত্যাগ করে ছাত্রদল।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে আসছেন, এমন খবরে সকাল থেকেই ছাত্রলীগের বিভিন্ন হলের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নেন। এ সময় তাদের হাতে ক্রিকেট স্ট্যাম্প, চাপাতি, ছুরি, রড দেখা যায়। অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সকাল ৯টা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন। মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে পৌঁছলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রড, চাপাতি, লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালান। এ সময় মানসুরা আলম নামে ছাত্রদলের এক নেত্রী আহত হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রলীগ হামলা করেছে। এতে অন্তত ৪০ নেতাকর্মী আহত হন। তাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’

এদিকে হামলার প্রতিবাদে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেলের সামনে থেকে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহীদুল্লাহ হলের সামনে গেলে হলের ভেতর থেকে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় লাঠিসোটা নিয়ে ছাত্রলীগকে ধাওয়া দেয় ছাত্রদল। হামলা ও ধাওয়ার এক পর্যায়ে শহীদুল্লাহ হলের ড্রেনে ফেলে ছাত্রদলের দুই নেতাকর্মীকে মারধর করতে দেখা গেছে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগ অবস্থান নেয় জিমনেসিয়ামের সামনে। আর ছাত্রদল অবস্থান নেয় দোয়েল চত্বরে। এ সময় দুইপক্ষের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে ছাত্রলীগ ধাওয়া দিলে কার্জন হল হয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। পরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে লাঠিসোটা নিয়ে দিনভর অবস্থান ও মোটরসাইকেল মহড়া দেখায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

হামলার শিকার ছাত্রদল নেত্রী মানসুরা আলম বলেন, ‘ছাত্রলীগের বিভিন্ন হলের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমি নিজে গুরুতর আহত হয়েছি। আমার হাতে ছাত্রলীগের এক সন্ত্রাসী চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়েছে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা করেছে তাতে কী হয়েছে। আমরা আবারও ক্যাম্পাসে যাব। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুলব।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন, ‘ছাত্রদল লাঠিসোটা নিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে এলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিহত করেন। ছাত্রদল কিলিং মিশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বহিরাগতদের নিয়ে তারা প্রবেশের চেষ্টা করে। তাদের বেশিরভাগই অছাত্র, চিহ্নিত ছাত্রশিবিরের ক্যাডার। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নই, ছাত্রদল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ক্যাম্পাসে আসার চেষ্টা করে। আমাদের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে তাদের প্রতিরোধ করার অধিকার রয়েছে। সে জায়গা থেকে আমরা সেøাগান দিয়েছি, শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাসের কথা বলেছি। অস্ত্র ধারণ করা ছাত্রদলের চরিত্র, ছাত্রলীগের নয়।’

শাহবাগ থানার ওসি মওদুত হাওলাদার জানান, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের ধাওয়া পাল্টাধাওয়া চলাকালে তিনজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে দুজন ছাত্রদলের কর্মী; অন্যজন সম্ভবত সাধারণ মানুষ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো পক্ষ থেকেই কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশন। পৃথক বিবৃতিতে সংগঠন দুটি হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত