মহামারীর কারণে বাচ্চার পড়াশোনায় অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাচ্চার পড়াশোনার চাপ বাড়ছে। সিলেবাস শেষ করতে হবে। তাই অযথাই স্কুল কামাই দেওয়াও যাবে না। অন্যদিকে প্রখর গরমে স্কুলের আঁটসাঁট ইউনিফরম ও জুতা-মোজা পরে দীর্ঘসময় স্কুলে থাকা এবং পানি কম পান করার কারণে অনেক বাচ্চাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মের এই সময় কীভাবে বাচ্চাকে সুস্থ রাখবেন? জানালেন চাইল্ড স্পেশালিস্ট মারিয়া কিবতিয়ার। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
সূর্যের প্রাণঝাঁঝানো তেজ, অন্যদিকে পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ। গরমে সুস্থ থাকতে, এই দু’টো চ্যালেঞ্জই সফলভাবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের। এই সময়টাতে বাচ্চারা নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। তাই বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। সুস্থ থাকতে গরম ও পড়াশোনার চাপ দুটো দিকই সমানভাবে ব্যালান্স করে চলতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে যেমন চলতে হবে, তেমনই বাচ্চার ডায়েট ও লাইফস্টাইলকেও করে তুলতে হবে সামার-ফ্রেন্ডলি।
গরমে যা হতে পারে
অতিরিক্ত গরমের মধ্যে দীর্ঘসময় স্কুলে থাকা এবং পোশাক ঘামে ভিজে ঠান্ডা লাগার পাশাপাশি পানিশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। এছাড়া স্কুলে যাওয়া ও আসার পথে দীর্ঘসময় রোদের মধ্যে থাকলে বাচ্চাদের কিছু সাধারণ শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সানবার্ন ও র্যাশ, হিটস্ট্রোক, ইউরিন ইনফেকশন, ডায়রিয়া ছাড়াও এই সময় দেখা দিতে পারে জ্বর, সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ। পাশাপাশি রোদের মধ্যে বাইরে দীর্ঘসময় খেলাধুলা করলে বা বাইরের খাবার থেকেও হতে পারে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি। জ্বর, ঠান্ডা লাগা ইত্যাদির মূল কারণ ঘন ঘন তাপমাত্রার পরিবর্তন। রোদ থেকে ফিরে সরাসরি এসি ঘরে বসা, বারবার ঘরে-বাইরে করা, অসময়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল করা, বরফঠান্ডা পানি খাওয়া ইত্যাদি ঘন ঘন শরীরে তাপমাত্রার পার্থক্য ঘটায়। যার ফলে ঠান্ডা লেগে যাওয়া স্বাভাবিক। উপরন্তু যদি বাচ্চার শ্বাস কষ্টের সমস্যা থাকে, তাহলে তাও এর কারণে হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে।
দিনের বেলা বাচ্চাদের বাইরে খেলতে যাওয়া বা কড়া রোদে অনেকক্ষণ থাকাও অনেক শারীরিক সমস্যা ডেকে আনতে পারে। কোনো প্রোটেকশন ছাড়া সরাসরি সূর্যের আলোয় থাকলে বাচ্চার নরম ত্বকে হতে পারে হিটর্যাশ, একজিমা এবং সানবার্ন। আর্দ্রতা কমে গিয়ে পানিশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। এর ফলে শরীর ক্লান্ত লাগতে পারে। শরীরে পানির ঘাটতি থেকে ইউরিন ইনফেকশন হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো ক্ষতিকর মনে না হলেও, সাবধানতা অবলম্বন না করলে আরও জটিল আকার নিতে পারে। পানি ও খাদ্যবাহিত রোগের প্রকোপ ভীষণ বাড়ে গরমের সময়টাতে। রাস্তার পাশে বা স্কুলের গেটের পাশে খোলা ভ্যানে বিক্রি হওয়া শরবত, কুলফি বা কাটা ফল গরমে উপাদেয় হলেও স্বাস্থ্যের পক্ষে একেবারেই ভালো নয়। ডায়রিয়া, টাইফয়েড বা অন্যান্য পেটের সমস্যার সবচেয়ে বড় কারণ এসব খাবার । এছাড়া জন্ডিস, হেপাটাইটিস-এ, ডিসেন্ট্রি ইত্যাদিও গরমে বাচ্চাদের অনেকটা দুর্বল করে ফেলে।
খোলামেলা পোশাক, জুতো পরার দরুন ইনসেক্ট বাইটের প্রবণতা বাড়ে। স্কুল থেকে ফিরে যেসব বাচ্চা নিয়মিত বাইরে খেলতে যায়, তাদের ক্ষেত্রে ইনসেক্ট বাইট খুবই কমন। একই সঙ্গে বাইরের ধুলোবালি লাগা হাত চোখে-মুখে লাগলে, তা থেকে হতে পারে কনজাংটিভাইটিস বা ‘পিঙ্ক আই’। গরমের কারণে অনেকেই বাথটাব বা সুইমিং পুলে গোসল করতে গিয়ে কানের ইনফেকশনও ভোগে। অনেক বাচ্চা আছে গরম থেকে ফিরে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি পান করেন। অনেকে আবার অতিরিক্ত আইসক্রিম ও ঠান্ডা কোমল পানীয় পান করে গলায় ইনফেকশন ও টনসিলের সমস্যা তৈরি করে।
গরমের সময় যা করবেন
প্রথমত সতর্ক থাকতে হবে। এই ধরনের সমস্যা যেমন স্বাভাবিক, তেমনই সতর্ক থাকলে এগুলো এড়ানোও সহজ। এছাড়া গরমের সময় দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা জরুরি। তার সঙ্গে প্রয়োজন সুষম ডায়েট এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
তীব্র গরমে পুরো স্বস্তিতে থাকা কঠিন। বিশেষ করে বাচ্চার। কারণ অল্পতেই ক্লান্ত লাগা, গা গুলানো, মাথা ঘোরা, শরীর ছেড়ে দেওয়া এগুলো হবেই। তাই শরীরকে যতেœ রাখতে হবে। স্কুলে আপনার বাচ্চা কতটা গরম বা ঠান্ডায়
থাকছে সেটা আপনার হাতে না থাকলেও স্কুলে যাওয়ার পথ এবং বাড়িতে থাকার সময়টাতে আপনি বাচ্চার দেখভাল করতে পারবেন। বাচ্চার স্কুলে যাওয়ার পথ যাতে স্বস্তিদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। নিজে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে এলে রোদের হাত থেকে বাঁচাতে রিকশার হুড, গাড়ির এসি দিয়ে নিন। যদি হেঁটে যান তবে সঙ্গে ছাতা রাখুন। বাচ্চা যদি গণপরিবহন বা স্কুলের বাসে যায় তবে সঙ্গে ছাতা, ক্যাপ দিয়ে দিন। প্রয়োজনে ক্যাপ পরে নিতে বলবেন। বাচ্চাকে দ্রুত ঠান্ডা থেকে গরমে বা গরম থেকে ঠান্ডায় যেতে নিষেধ করুন। যেমন, এসি গাড়িতে বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো জায়গায় বেশ খানিকক্ষণ থাকার পর, চট করে রোদে বেরুতে দেবেন না। প্রয়োজন হলে ছাতা ব্যবহার করতে দিন। কিছুক্ষণ এসি বন্ধ রেখে (অন্তত আধঘণ্টা) তারপর গরমে যেতে দিন। রোদ থেকে ফিরলে আধঘণ্টা ছায়ায় দাঁড়িয়ে তবে এসিতে প্রবেশ করতে বলুন। তাপমাত্রার পরিবর্তন যত ধীরে হবে, শরীর তত সময় পাবে নতুন তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার। এতে সাধারণ ঠান্ডা লাগার সমস্যা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বাইরে না বেরুনোই ভালো। যদি বেরুতেই হয়, তাহলে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়ে তবেই বাচ্চাকে বাড়ির বাইরে পাঠান। ছাতা, টুপি, সানগ্লাস ব্যবহার করার পাশাপাশি সানস্ক্রিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজার বা র্যাশক্রিম ব্যবহার করুন। সানবার্ন বা হিটর্যাশ হলে ক্যালামাইন লোশন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে স্টেরয়েড ক্রিম লাগানো যেতে পারে। বাচ্চা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর কিছু বিষয় খেয়াল রাখবেন। বাচ্চার শরীরের পিএইচ ব্যালেন্স ঠিক রাখতে লবণ চিনির বা লেবুর শরবত পান করাতে পারেন। বাচ্চা ভালো করে গোসল করে কি-না এটাও খেয়াল রাখুন। আর এই সময় ক্লান্তি খুব বাড়ে। তাই পর্যাপ্ত বিশ্রামও প্রয়োজন। যদি মনে করেন বাচ্চার শরীর বেশি খারাপ লাগছে বা অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করছে তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বাচ্চার খাবার-দাবারের দিকে সবসময় খেয়াল রাখুন। লবণ-চিনির শরবত তো খাওয়াবেনই। এছাড়া গরমের সময় মৌসুমি ফল ও সবজি অর্থাৎ যাতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে এসব সবজি বাচ্চাকে খাওয়াতে হবে। এমনিতেই অনেক বাচ্চা সবজি খেতে চায় না। তাদের জন্য কম তেল-মসলা দিয়ে মুখরোচক করে সবজি রান্না করে নিন। এই সময়টা বাইরের খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, বেশি চিনিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব বাদ দিন।এই ধরনের খাবার শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে। গরমে ঘেমে অনেক সময় বাচ্চার ত্বকে একজিমা দেখা দিতে পারে। এরকমটা হলে বাচ্চার ত্বকে তেল লাগাবেন না একেবারেই। এতে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তেলে মূলত ঘাম বেশি হয় যা একজিমা আরও বাড়িয়ে দেয়। ত্বক ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন, যাতে ঘাম কম হয়। ক্যালামাইন লোশন লাগাতে পারেন। গরমের এই সময়ে বাড়ির খাবার ছাড়া কোনো ধরনের বাইরের খাবার না খাওয়াই ভালো। বাইরে বেরুলে সঙ্গে সবসময় পানির বোতল দিয়ে দিন। র যেন পানিশূন্যতা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। স্কুল বা বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে হাত-পা ভালোভাবে ধুয়ে নিতে বলুন। এতে পানিবাহিত এবং খাবারের মাধ্যমে ছড়ায় এরকম রোগের প্রকোপ অনেকটা কমবে। নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও কমবে। কোনোভাবে পেটের সমস্যা বা ডায়রিয়া হলে দ্রুতই ওরস্যালাইন খেতে দিন। গরমে সুতির হালকা পোশাক পরান। মোট কথা এমন কাপড় বেছে নিন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। বাথটাবে বা সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সময় কানের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে ইয়ারমাস্ক বা ইয়ারপ্লাগ পরিয়ে দিন। ঠান্ডা পানি পান করা থেকে বাচ্চাকে বিরত রাখুন। বাচ্চার স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। দীর্ঘ দুই আড়াই বছর পর বাচ্চা স্কুলে যাচ্ছে। নানারকম অসুবিধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব বাচ্চা নতুন নতুন স্কুলে যাচ্ছে। প্রয়োজনে বাচ্চার নানা ধরনের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলুন। মনে রাখবেন আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে বিরূপ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি বাচ্চার অভিভাবক হিসেবে প্রথমে আপনাকেই শিখতে হবে।
