প্যানেলভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতি দিন দিন জেঁকে বসছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি)। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন শিক্ষকদের মধ্যে বাড়ছে দলীয় বিভক্তি। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপরে। মানসম্মত গবেষণা কমার পাশাপাশি পড়ালেখার মানও হচ্ছে নিম্নমুখী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা এমনিতেই ক্লাস নিতে চান না। নামমাত্র ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করেন। এর ওপরে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে বিভাগগুলোতে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি। যার প্রভাব পড়ছে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশে।
তিন মাস আগে ইবি বঙ্গবন্ধু পরিষদ শিক্ষক ইউনিটের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়; যা গঠনতন্ত্রবিরোধী দাবি করে কমিটির সদস্যদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে কেন্দ্র ঘোষিত কমিটি। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর ইবি শাখার কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদ। এর কিছুদিন পরই ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু পরিষদের শিক্ষক ইউনিট গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিষদের শিক্ষকদের মাঝে বিভক্তির সৃষ্টি হয়; যা এখনো চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রদবদলের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষকদের প্যানেলেরও শক্তিমত্তার পরিবর্তন হয়। নিজেদের প্যানেল ভারী করতে নতুন শিক্ষকদের টার্গেট করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইবিতে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষকদের পাঁচটি আলাদা সংগঠন রয়েছে। আওয়ামীপন্থি ও প্রগতিশীল শিক্ষকদের সংগঠন শাপলা ফোরাম। একই মতাদর্শের হলেও এই সংগঠনের শিক্ষকরা দুই ভাগে বিভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রদবদলের ওপর ভিত্তি করে এই সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের বঙ্গবন্ধু পরিষদ নামে আরও একটি সংগঠন রয়েছে। এতেও দুই ভাগে বিভক্ত শিক্ষকরা। অন্যদিকে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের ‘জিয়া পরিষদ’ ও ‘সাদা দল’ নামে দুটি আলাদা সংগঠন রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন গ্রিন ফোরাম। কয়েক মাস ধরে বঙ্গবন্ধু পরিষদ নিয়ে টানাটানি করছেন আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা। কেন্দ্র ঘোষিত বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদ শিক্ষক ইউনিটের মাঝে চলছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। সর্বশেষ গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। শিক্ষকদের এমন কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় তোলেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে নিজেদের দল ভারী করতে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নতুন শিক্ষকদের টার্গেট করেন শিক্ষক নেতারা। আর নতুন শিক্ষকরা কোনো দলে না ভিড়লেও বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। ফলে বাধ্য হয়েই রাজনীতিতে আসতে হচ্ছে তাদের। যার প্রভাবে ব্যাঘাত ঘটে ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণে। এ ছাড়া প্রতি বছর শিক্ষক সমিতির নির্বাচন এলে বিভক্তির মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আওয়ামী ও বিএনপিপন্থি মতাদর্শের শিক্ষকদের মধ্য থেকে আলাদা আলাদা প্যানেল হয়। নির্বাচনের কমপক্ষে এক মাস আগে শিক্ষক নেতারা ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণে অমনোযোগী হয়ে যান। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও কলামিস্ট অধ্যাপক মো. আব্দুল মুঈদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষকরা এখন আর আদর্শিক রাজনীতিতে নেই। ক্ষমতার রাজনীতিতে ঢুকে গেছে। আর এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় পড়ছে।’ এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে শিক্ষকরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে বহুগুণে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি থাকতেই পারে। তবে শিক্ষকরা ক্ষমতার জন্য নিজের অবস্থান ধরে রাখতে না পারলে তা লজ্জাজনক।’
