কোরআনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার কারণ

আপডেট : ১১ জুন ২০২২, ১০:৫৬ পিএম

ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত। তবে কোরআন তেলাওয়াতের সঙ্গে সঙ্গে কোরআনের অর্থ অনুধাবন, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা এবং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো আরও সর্বোত্তম এবং উপকারী বিষয়। কোরআন মাজিদ একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান সব মুসলমানের জন্য। এখানে আছে বিধান, প্রতিবিধান, দৃষ্টান্তমূলক দৃষ্টান্ত, জ্ঞান, উপদেশ, ঐতিহাসিক ঘটনা, বৈজ্ঞানিক এবং মহাজাগতিক সৃষ্টির সব বিষয়, যা বিশ্বাসীদের আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুসারে তাদের জীবন পরিচালনা করতে সহায়তা করে। কোরআন মাজিদ বস্তুজগতের সব বিষয়েই সঠিক ও পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং আমি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি সব বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ এবং মুসলমানদের জন্য হেদায়েত, রহমত ও সুসংবাদস্বরূপ।’ সুরা আন নাহল : ৮৯

একজন মুসলিমকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালন করতে হয়। সেজন্য কোরআন মাজিদের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। যে যে কারণে কোরআন মাজিদের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়তে পারে মুমিন-মুসলমানকে সেসব বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোরআনে কারিমের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত না রাখলে দুনিয়া ও আখেরাতে নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। কোরআনে কারিমের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার কারণের অন্যতম হলো

পাপ কাজে জড়িত থাকা : পাপ কাজগুলো মানুষকে কোরআন মাজিদের প্রতি মনোযোগী হওয়া থেকে বাধা দেয়। যেকোনো পাপের কাজে লিপ্ত ব্যক্তির পক্ষে কোরআন মাজিদের সংস্রব পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। হজরত হুজাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘দুনিয়ার প্রলোভনগুলো যখন মানুষের হৃদয়ে উপস্থাপিত হয়, তখন যেকোনো হৃদয় তা দ্বারা প্রভাবিত হলে তাতে একটি কালো দাগ দেখা দেবে। আর যেকোনো হৃদয় তা প্রত্যাখ্যান করলে তাতে একটি সাদা চিহ্ন থাকবে। এর ফলে হৃৎপিণ্ড হবে দুই প্রকারের। একটি শ্বেতপাথরের মতো সাদা, যা কোনো অশান্তি কিংবা ফিতনা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, যতক্ষণ আসমান ও জমিন থাকবে। অন্যটি কালো এবং ধূলিকণাযুক্ত একটি পাত্রের মতো। যা উল্টে যায়, যা ভালো তা চিনতে পারে না কিংবা যা জঘন্য তা প্রত্যাখ্যান করে না, বরং আবেগে ও প্রলোভনে আল্লাহর বিধান তথা কোরআন থেকে দূরে সরে যায়।’ সহিহ মুসলিম

শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাপ : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে; আর একজন মুহাজির (হিজরতকারী) সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে।’ সহিহ বোখারি

যাদের মুখ, হাত, আচার-আচরণ থেকে মানুষ নিরাপদ নয়, তারা কোরআন মুখস্থ ও কোরআন তেলাওয়াতের মতো নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কারণ তারা অন্যদের ক্ষতির কারণ। আর যে মানুষের ক্ষতি করবে, সে আল্লাহর রহমত পেতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং কোনো পাপে জড়িয়ে গেলে, শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাপের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলে এখনই তা পরিত্যাগ করা।

তাফসির জানার চেষ্টা না করা : যে ব্যক্তি কোরআনে কারিমের আয়াতের অর্থ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অধ্যয়নের জন্য কোনো চেষ্টা করে না, সে তার জীবনে কোরআন মাজিদের সঠিক শিক্ষা ও বিধান যথাযথভাবে প্রতিফলন করতে পারে না। এ ধরনের ব্যক্তি কখনোই আয়াতের সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা পেতে সক্ষম হবে না। আল্লাহ বলছেন, ‘তাহলে কি তারা কোরআনে চিন্তা করে না? এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এর মধ্যে অনেক বৈপরীত্য খুঁজে পেত।’ সুরা আন নিসা : ৮২

কোরআনে বর্ণিত ঘটনা থেকে শিক্ষা না নেওয়া : অনেকে মনে করেন, কোরআনে কারিমে বর্ণিত নানা ঘটনা ও গল্পগুলোর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কেন আমরা হজরত মুসা (আ.), হজরত ঈসা (আ.), হজরত হুদ (আ.)-এর বংশধরদের নিয়ে চিন্তা করব? কেন আমরা আগেকার ‘বিধ্বস্ত’ জাতি সম্পর্কে চিন্তা করব? পুরনো দিনের ঘটনা জেনে আমাদের কী লাভ ইত্যাদি ইত্যাদি।

মূলত কোরআন মাজিদ আমাদের কাছে নাজিল করা হয়েছে, যাতে আমরা তা পাঠ করি, এর বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা করি এবং কোরআনে কারিমে থাকা নানা দৃষ্টান্ত ও ঘটনাসমূহ থেকে শিক্ষা নিই। কোরআন নিছক একটি ঐতিহাসিক গল্প গ্রন্থ নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য সঠিক পথের নির্দেশিকা। ‘কোরআনে উল্লিখিত কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্য পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হেদায়েত।’ সুরা ইউসুফ : ১১১

শুধু কোরআন খতমের মানসিকতা : প্রায়ই আমরা কোরআনে কারিমের প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য চেষ্টা করি না। এর বদলে কোরআন তেলাওয়াত নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। নিঃসন্দেহে কোরআন তেলাওয়াত অত্যন্ত উত্তম ইবাদত। তবে যাদের সুযোগ ও সামর্থ্য আছে তাদের জন্য উচিত কোরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি তার অর্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে জানা। অর্থ জেনে-বুঝে কোরআন তেলাওয়াতের প্রয়োজনীয়তার কারণে তিন দিনের কম সময়ে সম্পূর্ণ কোরআন খতম করা বাঞ্ছনীয় নয় বলে অনেক ইসলামি স্কলার মত দিয়েছেন। কারণ দ্রুত তেলাওয়াত মানুষকে এর আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বাধা দেয়।

পার্থিব জীবনের জন্য অতিরিক্ত ভালোবাসা : সবাই আমাদের সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পদ, অলংকার, পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাসকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসা মধ্যপন্থি এবং ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত। কোরআন মাজিদ ও আধ্যাত্মিকতার ভালোবাসার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা উচিত নয়। অর্থাৎ দুনিয়ার ভালোবাসার মোহে কোরআন তেলাওয়াত ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের জন্য সুশোভিত হয়েছে সে যা কামনা করে নারী ও পুত্রদের, সোনা-রুপার স্তূপ, সূক্ষ্ম দানাদার ঘোড়া, গবাদি পশু ও চাষের জমি। এটাই পার্থিব জীবনের ভোগ, কিন্তু আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তন।’ সুরা আলে ইমরান : ১৪

অমনোযোগী অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত : কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত থেকে একজন মুমিন উপকৃত না হওয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অমনোযোগী হৃদয়ে কোরআন তেলাওয়াত। একইভাবে, একজন গাফিল ও অনুপস্থিত হৃদয়ের মানুষ দ্বারা পরিচালিত প্রার্থনা কবুল হয় না। ‘সুতরাং যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তা শোনো এবং মনোযোগ দাও যাতে তোমরা রহমত লাভ করতে পারো।’ সুরা আল আরাফ : ২০৪

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত