চলতি বছরের মধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় বাংলাদেশ। দেড় বছর পর গতকাল মঙ্গলবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে এই তাগিদ দেওয়া হয় নেপিদোকে। কবে থেকে প্রত্যাবাসন হবে সে বিষয়ে কিছুই ঠিক হয়নি বৈঠকে।
এ দিন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ৫ম বৈঠক ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব উ চ্যান আই।
বৈঠকের পর মাসুদ বিন মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমরা এ বছরই প্রত্যাবাসন শুরু করতে চাই। এটা তাদের জানিয়েছি। দুই দেশের মধ্যে অনেক দিন পর দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে এবং আগামী দিনে এটি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য উভয়পক্ষ আলোচনা করেছে।
রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু, তাদের যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তিকরণ ও ফেরত যেতে আগ্রহীদের নিরাপত্তা ও জীবিকা নিশ্চিত করার ওপর বাংলাদেশ থেকে জোর দেওয়া হয়।
এর আগে ২০১৯ সালের মে মাসে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ৪র্থ বৈঠক নেপিদোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে গত তিন বছরে এই বৈঠক হয়নি।
এই বৈঠক থেকে প্রত্যাবাসনের চূড়ান্ত কোনো তারিখ ঘোষণা না এলেও বৈঠক হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা আমাদের জন্য জরুরি। আর এরজন্য আলোচনা বন্ধ থাকা ঠিক নয়। মিয়ানমারে সেনা শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে টেকনিক্যাল কমিটির মধ্যে চিঠি চালাচালি হচ্ছে। এরইমধ্যে অ্যাড-হক টাস্কফোর্স ফর ভেরিফিকেশন অব দ্য ডিসপ্লেসড পার্সনস ফ্রম রাখাইনের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়নি। আজ (গতকাল) দুই দেশের সচিব পর্যায়ের এই বৈঠক অবশ্যই ইতিবাচক।
২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল পরের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দুদেশের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হবে। কিন্তু ওই মাসের শুরুতেই মিয়ানমারে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। মিয়ানমারে অং সান সু চির সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে সামরিক জান্তা। এরপর ওই বছর আর আলোচনার টেবিলে বসতে পারেনি ঢাকা-নেপিদো। এর দীর্ঘ এক বছর পর চলতি বছরের শুরুর দিকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসে দুদেশ। অ্যাড-হক টাস্কফোর্স ফর ভেরিফিকেশন অব দ্য ডিসপ্লেসড পার্সনস ফ্রম রাখাইনের ওই বৈঠকই ছিল সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর টেকনিক্যাল কমিটি পর্যায়ে দুদেশের প্রথম বৈঠক।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পর এখন পর্যন্ত আট দফায় মিয়ানমারের কাছে ৮ লাখ ৩০ হাজার জনের তালিকা দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে মিয়ানমার মাত্র ৪২ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে ফেরত দিয়েছে। তবে এ তালিকা এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে। কেননা, এ তালিকায় একই পরিবারের অনেকের নাম নেই। এবারের বৈঠকে অসম্পূর্ণ তালিকার বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের দেওয়া তালিকায় কী খুঁত রয়েছে সেগুলোর বিষয়েও আলোচনা হবে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে বাংলাদেশে ছিল চার লাখ রোহিঙ্গা। আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি।
