সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ দেশের বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ত্রাণ তৎপরতাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হলেই কেন্দ্রীয় নেতারা দুর্গত এলাকায় যাবেন। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার নেতারা দুর্গতদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। বন্যা পরিস্থিতিতে বিএনপির কার্যক্রম সম্পর্কে গতকাল সোমবার দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, সরকারের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও ত্রাণ তৎপরতা অপর্যাপ্ত। বন্যার কারণে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা।
বিএনপি গঠিত ত্রাণ কমিটির প্রধান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক নেই। বন্যার কারণে সেখানে অবস্থান করার মতো হোটেল নেই। নেতাদের বাসাবাড়িও বন্যার পানিতে প্লাবিত। তাছাড়া আমরা ক্ষমতায় নেই, এমনকি বিরোধী দলেও নেই যে হেলিকপ্টার নিয়ে বন্যাদুর্গত এলাকায় যাব। বিমান চলাচলও স্বাভাবিক নেই। তাই জেলা নেতারা বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কেন্দ্র থেকে জেলা নেতাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে আমরা সেখানে যাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতিবিদ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে বন্যাদুর্গতদের পাশে থাকার। আমরা জেলা নেতাদের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছি। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সরকারের। সব সুযোগ-সুবিধাও আছে সরকারের। এজন্য আমরা বিভিন্ন জেলার বন্যাদুর্গতদের সহযোগিতা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি।’
টুকু বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমাদের দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে দলের নেতাকর্মীদের সাধ্যমতো বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সামর্থ্যবানদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা গত রবিবার দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছিÑ কীভাবে বন্যাদুর্গতদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানো যায়।’
জেলার কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘সিলেট ও সুনামগঞ্জের জেলা নেতারা অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে দুবেলা রান্না করা খাবার বিতরণ করছেন। কেন্দ্র থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান ও সদস্য সচিব আমিনুল হককে নেত্রকোনায় পাঠানো হচ্ছে। যেখানে যাওয়া সম্ভব সেখানে দলের নেতারা যাবেন।’
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বরাত দিয়ে টুকু বলেন, ‘বন্যার কারণে সাংগঠনিক পুনর্গঠন কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রথমে যখন সুনামগঞ্জে বন্যা হয় তখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেলা বিএনপি নেতাদের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপর সিলেট জেলা নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি যেসব জেলা দিয়ে নেমে আসবে সেসব জেলা নেতাদের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নয়, সর্বোচ্চসংখ্যক বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব আমরা।’
সাবেক এ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি দলের নেতাকর্মীরা বন্যাকবলিত মানুষের কাছে বিএনপির ব্যানারে ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং প্রতিটি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন পৃথকভাবে বন্যাকে কেন্দ্র করে একটি কমিটি গঠন করে কার্যক্রমকে গতিশীল রাখবে। গঠিত কমিটির কাজ হচ্ছে কার্যক্রম মনিটরিং করা। সেজন্য আগামী দুদিনের মধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে প্রতিবেদন আকারে ত্রাণ কমিটির কাছে জমা দেবে। ২১ জুন আবার বৈঠক হবে ত্রাণ কমিটির।’
যুবদলের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের জন্য কী ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে জানতে চাইলে যুবদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা কাজ করছি। গতকাল নিজেরা বৈঠক করেছি। আমাদের সংগঠনের নেতারা শুরু থেকেই কাজ করছে। আমরা তাদের নির্দেশনা দিচ্ছি এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছি।’
এদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রবিবারের বৈঠকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের কাজ জেলা নেতারা করছেন। আমরা তাদের নির্দেশনা দিয়েছি।’
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল ও কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তারা তাদের মতো কাজ করে যাচ্ছেন। সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ত্রাণ কমিটির কার্যক্রম সমন্বয় করবেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তার নেতৃত্বে দপ্তরসংশ্লিষ্ট নেতারা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবেন।
বন্যার্তদের মাঝে নেই আওয়ামী লীগের এমপিরা-কাইয়ুম চৌধুরী : সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি, তারা নিশিরাতে জনগণের ভোট চুরি করে ক্ষমতা দখল করেছে। ফলে সিলেটবাসী বন্যার পানিতে সাঁতার কাটলেও তাদের এমপিরা ঢাকায় বসে আরাম-আয়েশ করছে। জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।’
গতকাল সোমবার সিলেট জেলা বিএনপির উদ্যোগে গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের বাঘের সড়ক এলাকায় বন্যাদুর্গত ১ হাজার ৩০০ পরিবার এবং দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাহিমপুর, টিকরপাড়া, কলারতল এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ১০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্যসহায়তা বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশে আজ কসমেটিকস উন্নয়নের নামে লুটপাট চলছে। শুধু ব্রিজ আর লাইটিং করার নাম উন্নয়ন নয়। একদিকে শতকোটি টাকা ব্যয় করে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের নামে জনগণের সঙ্গে প্রহসন করা হচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ বন্যার পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। আওয়ামী লীগকে একসময় সবকিছুর হিসাব দিতে হবে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের বাঘের সড়ক এলাকায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম স্বপনের সহযোগিতায় ১ হাজার ৩০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্যসহায়তা বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম আহমদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুব আলম, সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কোহিনুর আহমদ, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম স্বপন, জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহিবুল হক, সিলেট জেলা বিএনপি নেতা শাকিল মোর্শেদ প্রমুখ।
