বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পুর প্রকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শামীম জেড বসুনিয়া পদ্মা সেতুর শুরু থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান হিসেবে ২০২০ সালে দায়িত্ব পান। বহু মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার এই পদ্মা সেতু প্রকল্পের সফল সমাপ্তি নিয়ে কথা বলেছেন দেশবরেণ্য এই প্রকৌশলী। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তোফাজ্জল হোসেন রুবেল
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সেতু পদ্মা প্রকল্প নিয়ে শুরুতেই নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি জানতে চাইলে শামীমুজ্জামান বসুনিয়া বলেন, ‘সেতু নিয়ে আমার ভালো লাগা ও আনন্দের যে ভাষা তা বলে বোঝানো যাবে না। এমন একটি কাজ শেষ করতে পারাটা ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। ফলে সেতু মানুষের কাজে লাগছে এর চেয়ে বড় খুশি আমার কাছে আর কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘আজ ২৫ জুন সমগ্র জাতির একটি দীর্ঘ আশার প্রতিফলন ঘটেছে। পদ্মার বুকে স্বপ্নের সেতু খুলছে। এ সেতু শুধু নদীর দুই প্রান্তকেই একত্র করছে না; দুই প্রান্তের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, ভালোবাসারও প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। এটি শুধু কংক্রিটের কাঠামো নয়; এটি একদিকে নদীর দুই প্রান্তের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের বন্ধনও। আবার দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের উন্নয়নের চলমান সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এ শুধু সেতু নয়; এ হলো সেতুবন্ধ। বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাস সংস্কৃতি সভ্যতার অবিচল পরীক্ষিত সন্তান। আর পদ্মা সেতু হলো এ দেশের মানুষের সংকল্প ও চেতনার ফসল। এ সেতু বাঙালি জাতির আভিজাত্য অহংকার ঔদ্বত্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।’
আন্তর্জাতিক মানদন্তে সেতুর অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, ‘যেকোনো দেশের একটি বড় রাস্তা বা সেতু কোনো কিছু করতে গেলে এর প্রকৌশলগত সমীক্ষা লাগে। এখন এ সমীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল এখানেও নানা ধরনের বিপত্তি রয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে একটা চ্যালেঞ্জ ছিল কারিগরি। ভূমি অধিগ্রহণ, সেতু নির্মাণ, রাস্তা, পাইলিং থেকে শুরু করে সব কটি কাজই চ্যালেঞ্জের।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে কোনো দুর্নীতি হয়নি। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ অনুযায়ী প্রথম পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের যে কথা বলা হলো পরে দেখা গেল তেমন কিছুই হয়নি। মূল সেতু নির্মাণের খরচ ১২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে নদী শাসনের (রিভার ট্রেনিং) জন্য খরচ হচ্ছে ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, দুদিকে সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার জন্য ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং জমি অধিগ্রহণ বাবদ ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ভ্যাট, ট্যাক্স, বিলসহ অন্যান্য খরচ ৩ হাজার কোটি টাকা।
আন্তার্জাতিক মানদণ্ডে পদ্মা সেতুর বেশ কিছু বিশেষত্ব আছে উল্লেখ করে শামীম বসুনিয়া বলেন, ‘যেকোনো দেশের বড় ধরনের স্থাপনা করতে গেলে সেখানে প্রকৌশলগত সমীক্ষা প্রয়োজন হয়। আগের সেতুগুলো এক লেন, দুই লেন। কিন্তু পদ্মা সেতু অনেক বড়। সেখানে চার লেন বললেও ভুল হবে। এর ব্যাপ্তি আরও বেশি। এ সেতু একই সঙ্গে সড়ক ও রেলসেতু, যার গভীরতম ১২২ মিটার পাইল ফাউন্ডেশন ব্যবহার করা হয়েছে। এ পাইলেরও রয়েছে প্রকৌশলগত বিশেষ দিন। পদ্মা সেতু এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে এক ধরনের বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে। নদীর গতিপথ ঠিক রাখতেও নদী শাসনব্যবস্থায় একটি প্রকল্প বেশ কিছু এলাকা নিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখানে পাইল বসানোর সময় বিশ্বের বৃহত্তম ও শক্তিশালী হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কষ্টসাধ্য এ কাজটি করতে গিয়ে দুটি গ্যামার ভেঙেও গেছে।’
সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কায় কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না জানিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সাধারণ পানির স্রোত বাড়লে এ ধরনের বড় আকারের পিলারের পাশে গিয়ে পানি এক ধরনের কুণ্ডলী তৈরি করে গভীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ কুণ্ডলীর ফলে পিলার পাশ থেকে মাটি সরে যায়। কিন্তু পদ্মা সেতুর পিলার এত গভীরে রয়েছে যে সেখানে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। আর পানির এ কুন্ডলীর কথা চিন্তা করে এক পিলারের জন্য যেন অন্য পিলার ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য দূরত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। এক পিলার থেকে অন্য পিলারের দূরত্ব প্রায় সাড়ে চারশ ফুট। আমাদের ফেরিগুলো অনায়াসে সেখান দিয়ে চলতে পারে। এর পরও যদি কোনো ফেরি স্রোতের চাপে পিলারে গিয়ে ধাক্কা লাগে তবে সেতুর কোনো ক্ষতি হবে না। বরং পিলারের সঙ্গে মাঝ বরাবর ধাক্কা লাগলে ফেরি উল্টে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
বিশে^র বড় বড় সেতুর সঙ্গে মিল রেখে এর নকশা ও নির্মাণকাজে উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে নিশ্চিত করে এর স্থায়িত্বকাল নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের স্ট্র্যাকচার ৭৫ বছরের জন্য করা হয়। তবে পদ্মা সেতুর ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে আমরা স্থায়িত্ব ১০০ বছর নিশ্চিত করতে পারি। এখানে রক্ষণাবেক্ষণ কাজটি এখনো পর্যন্ত যা সিদ্ধান্ত আছে এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী করবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে স্টিল ও কংক্রিটের সংমিশ্রণে সেতু হলেও পদ্মা সেতুর কিছু ব্যাপকতা বেশি। যদিও আমরা দেখেছি চীনের নানজিং ইয়াংজি সেতু, জাপানের সেতো সেতু, ভারতের বগিবিল সেতুসহ উন্নত দেশগুলোতে এমন সেতু আগেই তারা নির্মাণ করেছে। তবে এমন গভীর নদীতে আমাদের কাজ করার ক্ষেত্রে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় একবার চীনের যে কোম্পানি কাজ করছে তাদের মালামালসহ নদীর পাড় ধসে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লন্ডনে একটি নদীর ওপর ১৭টি সেতু আছে। পদ্মা ঘিরে আমাদেরও চাহিদা আসছে। আমাদের যদি চাহিদা বেশি থাকে তাহলে প্রয়োজনে আরও সেতু হতে পারে। এখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন তা আসলে সত্যিই অবিশ্বাস্ব। পদ্মা সেতু করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ একটি বার্তা দিয়েছে। এখানে বাংলাদেশ শুধু সেতুই নির্মাণ করেনি; এখানে কারিগরি সক্ষমতাও বেড়েছে। সেতুর কাজে সব মিলিয়ে চার হাজার প্রকৌশলী দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে আমাদের দেশের প্রায় ৫০০ প্রকৌশলী ছিলেন। তাদের দক্ষতা বেড়েছে।’
