শর্ত না মানলে ঈদে ঢাকার বাইরেও সামাজিক সংক্রমণ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ০১:৩৮ এএম

দেশে করোনা সংক্রমণের উল্লম্ফন কিছুটা কমেছে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজারের ওপরে-নিচে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহ আগেও সংক্রমণ যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল, এখন সেটা দেখা যাচ্ছে না। তবে এ স্থিতিশীল অবস্থা থেকে সংক্রমণ আবার বাড়বে নাকি কমবে সেটা নির্ভর করছে ঈদুল আজহার ওপর।

করোনা মহামারীর সময় অনুষ্ঠিত গত পাঁচ ঈদের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের সময় মানুষের যাতায়াত, কোরবানির পশুর হাট এবং ঈদকেন্দ্রিক জনসমাগমকে কেন্দ্র করে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এ সময় মানুষ সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে ও মাস্ক না পরলে অন্যবারের মতো এবারও ঈদের পর সংক্রমণ ফের বেড়ে যেতে পারে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অধিকাংশ জেলায় করোনার ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন বা গুচ্ছ সংক্রমণ হচ্ছে। ঈদে সেটা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণে রূপ নিতে পারে।’

এ সময় সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক ব্যবহারই প্রধান উপাদান বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও দেশের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের সময় আমরা সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্বে মাস্ক পরি, সেটাও করোনা প্রতিরোধে কিছুটা সক্ষম হবে।’

শেষ ৯ দিনে সংক্রমণ কমেছে ৪২১% : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৯ দিনে (২৭ জুন-৫ জুলাই) তার আগের ৯ দিনের (১৮-২৬ জুন) তুলনায় দেশে করোনা সংক্রমণ কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। গত ২৭ জুন থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দৈনিক শনাক্ত রোগী ঘুরেফিরে দুই হাজারের আশপাশে ওঠানামা করেছে। কিন্তু তার আগের ৯ দিনে দৈনিক শনাক্ত রোগী সর্বনিম্ন ৩০৪ জন থেকে বাড়তে বাড়তে সর্বশেষ ১ হাজার ৬৮০ জনে পৌঁছায়।

দেশে শেষ ৯ দিনে (২৭ জুন-৫ জুলাই) করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৯ ও দৈনিক গড় রোগী ১ হাজার ৯৭৮ জন। তার আগের ৯ দিনে (১৮-২৬ জুন) রোগী ছিল ৯ হাজার ৭৪৬ ও দৈনিক গড় রোগী ১ হাজার ৮৩ জন। তারও আগের ৯ দিনে (৯-১৭ জুন) শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬১৫ ও দৈনিক গড় রোগী ১৭৯ জন। এই ২৭ দিনে দৈনিক রোগী বৃদ্ধির সংখ্যা হিসাব করে দেখা গেছে, শেষ ৯ দিনে রোগী বৃদ্ধির হার ছিল ৮২ দশমিক ৬২ শতাংশ। তার আগের ১৯ দিনে রোগী বৃদ্ধির হার ছিল ৫০৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। সে হিসাবে ৯ দিনের ব্যবধানে দেশে রোগী কমেছে ৪২১ শতাংশ।

ঈদে অন্য জেলায় সামাজিক সংক্রমণের শঙ্কা : গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ চলছে। এ সময় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছিল এ দুই বিভাগে। এ সময় সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৩ রোগী শনাক্ত হয় ঢাকায় ও চট্টগ্রামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৬৪ জন। অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অন্যান্য জেলায় এখনো ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন বা গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণ চলছে। তবে কোরবানির ঈদে স্বাস্থ্যবিধিতে শিথিলতা দেখা দিলে ঈদের পর এসব জেলায়ও কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংক্রমণের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে। অন্যান্য জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে ক্লাস্টার বা গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণ হচ্ছে। ঈদের কারণে সংক্রমণ বাড়লে, সেসব এলাকায়ও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে যাবে।’

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ স্থিতিশীল। দৈনিক দুই হাজার রোগীর ওপরে-নিচে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহ আগেও যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল, এখন সেটা দেখা যাচ্ছে না। তবে এ স্থিতিশীল অবস্থা থেকে নেমে যাবে নাকি ওপরে উঠবে সেটা নির্ভর করছে ঈদের ওপর। যদি ঈদের কারণে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে। এখনো অধিকাংশ রোগী ঢাকার। তবে অন্যান্য স্থানেও ছড়াচ্ছে। অবস্থা জটিল হলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগীরা ঢাকায় চলে আসে। সে কারণে ঢাকায় মৃত্যু বেশি দেখায়।’

তিনি বলেন, ‘এখন সংক্রমণ স্থিতিশীল হলেও সামনে মৃত্যুটা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংক্রমণের তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ঝুঁকিটা থাকে। আর এখন থেকে যদি সংক্রমণটা কমে, সেটার প্রভাবটা আরও দুই-তিন সপ্তাহ পরে দেখতে পাব। তখন মৃত্যুর সংখ্যাটা কম দেখতে পাব।’

ঈদে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি : এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। কারণ এখন যে সংক্রমণ হচ্ছে সেটা ঢাকাকেন্দ্রিক। ঈদের সময় মানুষ ঢাকা থেকে দেশজুড়ে যাবে। যাওয়ার সময় যদি কিছু মানুষও সংক্রমণ নিয়ে যায়, তাহলে তারা গ্রামে কিছু লোকের মধ্যে ছড়াবে। গ্রামের সঙ্গে শহরের একটা পার্থক্য হচ্ছে গ্রামে এখনো বেশ কিছু বয়স্ক মানুষ টিকার আওতার বাইরে। তাদের কেউ এক ডোজ টিকাও নেননি, কেউ দুই ডোজ টিকা সম্পূর্ণ করেননি। এছাড়া পশুর হাট আছে। আমরা গত কোরবানির ঈদের সময়ও দেখেছি, হাটে মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে না। সুতরাং এসব হাট থেকেও মানুষ সংক্রমণ নিয়ে যাবে। মার্কেটের কেনাকাটা আছে। ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় লঞ্চ, ট্রেন, বাস, ফেরিতে লোকজন কাছাকাছি আসবে। সেখানেও সংক্রমণ ছড়াবে। সব মিলে ঈদে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।’

এ ব্যাপারে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, সামাজিক মেলামেশা, রাজনৈতিক আড্ডা ও ধর্মীয় মেলামেশা হবে। মসজিদের ভেতর না করে ঈদের সব জামাত খোলা জায়গায় বাইরে করতে হবে। বদ্ধ জায়গায় বেশি লোক মানেই সংক্রমণটা বেশি ছড়াবে। ঈদে যদি সতর্ক না হই, তাহলে এখন যদি ঢেউটা নেমেও যায়; এ ঢেউটা আবার বেশি শক্তি নিয়ে ঈদের কয়েক সপ্তাহ পরে আবার বেড়ে যাবে। তখন সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়বে। সাধারণত একটা ঢেউ থেকে আরেকটা ঢেউয়ের দূরত্ব হয় তিন মাস। ঈদের কারণে সেটা তিন মাসের আগেই পরবর্তী ঢেউ শুরু হয়ে যাবে।’

একটাই সতর্কতা মাস্ক : ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে একটাই সতর্কতা সেটা হলো মাস্ক ব্যবহার বাড়ানো। এটার জন্য ব্যক্তি ও সরকারি দুভাবেই উদ্যোগ নেওয়া দরকার। দুয়েক দিনের মধ্যেই মানুষের ঈদযাত্রা শুরু হবে। বিভিন্ন যানবাহনে করে মানুষ যাতায়াত করবে। এ সময় বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, ট্রেন স্টেশনে কিছু পুলিশ দেওয়া যায়, যারা যাত্রীরা মাস্ক পরেছে কি না তদারকি করবে। এসব স্থানে ব্যাপক মাইকিং করে, মাস্কের বাক্স রাখে, বিক্রিও করা যেতে পারে। আবার বাস, লঞ্চ, ট্রেন কর্র্তৃপক্ষ যদি মাস্ক ছাড়া যাত্রী বহন না করে, তাহলেও মাস্ক ব্যবহার বাড়বে। আর যদি কেউ মাস্ক ছাড়া যানবাহনে ওঠে, তাকে বড় জরিমানা করতে হবে। হাটের ইজারাদাররা যদি কড়াকড়ি করে যে কেউ মাস্ক ছাড়া ঢুকবে না, তাহলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘নিজেদেরও উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিত। যারা ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন, তারা যদি করোনা নিয়ে যান, বাড়িতে ও নির্দিষ্ট কিছু লোকের মধ্যে করোনা ছড়ান, তাহলে তার মৃত্যুর ঝুঁকিও আছে। সুতরাং প্রত্যেকেই যেহেতু পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আছেন সেই দায়িত্ববোধ থেকেও এ সময়টাতে মাস্ক পরা দরকার। আমরা সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্বে মাস্ক পরি, সেটাও করোনা প্রতিরোধে কিছুটা সক্ষম হবে।’

স্বাস্থ্যবিধি ও টিকায় শৈথিল্য নয় : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যারা টিকা নেননি, বিশেষ করে বুস্টার ডোজ নেননি, তাদের টিকা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, যাদের ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স ও অন্য রোগ আছে, যারা সম্মুখসারির করোনা যোদ্ধা স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যারা ফিল্ডে ডিউটি করেন, তাদের শতকরা একশ ভাগ টিকা নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে এখন সংক্রমণের যে কিছুটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি ঈদের পর সেটা আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। তখন টিকা না নেওয়ার কারণে মৃত্যু ও সংক্রমণ জটিলতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে আসন্ন ঈদুল আজহার সময় জনসমাগম রোধ করা না গেলে ওমিক্রনের বিএ.৫ উপধরনের কারণে করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণ আবার বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক জনগোষ্ঠী।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত