প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে তার সরকারি বাসভবন ঘেরাও করতে এসেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। গোপন গোয়েন্দাসূত্রে এ খবর পেয়ে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় একদিন আগেই সরকারি বাসভবন থেকে পালিয়ে যান শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে।
কিন্তু প্রেসিডেন্টের পালিয়ে যাওয়ার খবর বিক্ষোভকারীদের অসন্তোষ না কমিয়ে বরং বাড়িয়ে দেয়। প্রেসিডেন্টের বাসভবন চত্বরে গিয়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান, তারপর এক পর্যায়ে ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, শত শত বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার বাসভবনে ঢুকে পড়েছেন। তারা বাড়ির ছাদে, বাগানে শ্রীলঙ্কার পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছেন।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের সুইমিং পুলে নেমে সাঁতার কাটছেন। এ সময় পুলের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক বিক্ষোভকারীকে লঙ্কান পতাকা উড়াতে দেখা যায়।
অপর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কিচেনে ঢুকে পড়েছেন একদল বিক্ষোভকারী। সেখানে ফ্রিজ খুলে খাবার খাচ্ছেন কেউ, কেউবা আটা-ময়দা, শাক-সবজি, মাছ-মাংস বের করে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অনেকে আবার প্রেসিডেন্টের বিছানা, সোফায় শুয়ে সেলিফি তুলে তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; আর মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে এসব ছবি ও ভিডিও।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে, গোয়েন্দাদের এমন তথ্য পাওয়ার পর শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে পালিয়ে যান গোতাবায়া রাজাপাক্ষে। বর্তমানে দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে তিনি অবস্থান করছেন বলে দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এদিকে, সারা দেশ থেকে ছুটে আসা মানুষের রাজধানী কলম্বোতে বিক্ষোভ এবং প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঢুকে পড়ার পর মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডেকেছেন লঙ্কান প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। একই সঙ্গে তিনি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে স্পিকারের প্রতিও অনুরোধ জানিয়েছেন।
শনিবার সকালে বিক্ষোভকারীরা পদত্যাগের দাবিতে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ঘেরাও করেন। প্রেসিডেন্টের পালিয়ে যাওয়ার খবর তাদের বিক্ষোভ না কমিয়ে বরং বাড়িয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সকালে গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের উদ্দেশে রাজধানী কলম্বোতে যে মিছিলটি বের হয়, সেটি চলতি বছরের সবচেয়ে দীর্ঘ মিছিল।
শনিবার রাজধানী কলম্বোতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এর এক পর্যায়ে বিক্ষোভ থেকে প্রেসিডেন্টের বাসভবন অভিমুখে যাত্রা করেন তারা। এ সময় পুলিশি প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার বাসভবনে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা।
পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশ এগিয়ে এলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘাত হয় তাদের। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সংঘাতে আহত হয়ে অন্তত ২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। করোনা মহামারি, জাতীয় অর্থনীতি পরিচালনায় সরকারের অদক্ষতা, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ তলানিতে নেমে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কায় বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি, খাবার এবং ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে পারছে না শ্রীলঙ্কা। ডিজেলের সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো। ফলে গত কয়েক মাস ধরে সেখানে দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না।
আর এই বিপর্যয়ের জন্য প্রেসিডেন্ট গোতাবায় রাজাপাক্ষেকে দায়ী করে গত মার্চ থেকেই তার পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন বিক্ষোভকারীর।
শনিবার (৯ জুলাই) রাজধানী কলম্বোতে বিক্ষোভ-সমাবেশে জন্য জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ঘিরে ফেলেন বিক্ষোভকারীরা। দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা শ্রীলঙ্কার জনগণ আবারও ফুঁসে উঠেছে।
এর আগে জনগণের ক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাক্ষে। তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।
নতুন করে বিক্ষোভ দমাতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামলাতে শুক্রবার কলম্বো ও কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ চলার ঘোষণা দেয় পুলিশ। এ সময় সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। তবে এ কারফিউ-এ শেষ রক্ষা হলো না।
কারফিউ জারির পর প্রেসিডেন্ট ভবনসহ কলম্বোর বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ। টহল দেয় সশস্ত্র পুলিশ ও সেনারা। শুক্রবার বিকেলে প্রায় ২০ হাজার সেনা-পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
