সিঙ্গাপুর বন্দর দিয়ে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড পরিবহনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার জন্য সিঙ্গাপুরকে অনুরোধ জানাবে ঢাকা। চট্টগ্রামের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের পর থেকে রাসায়নিক রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে সিঙ্গাপুর। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ রবিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিপিং এজেন্টরা বলেছেন, যদি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস (আইএমডিজি) কোড অনুসরণ করে প্যাকেজিং করা হয় এবং সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে তাহলে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানিকারকদের অভিযোগ ৪ জুন বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৪৯ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার পর থেকে শিপিং এজেন্টগুলো বাংলাদেশ থেকে রাসায়নিক পণ্য পরিবহন করেনি। তারা আরও বলেন, শিপিং এজেন্টদের অসহযোগিতার কারণে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং এতে তারা বাজার হারাচ্ছেন। বাংলাদেশ বছরে ২ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের হাইড্রোজেন পারক্সাইড রপ্তানি করে।
অন্যদিকে শিপিং এজেন্টরা জানান, বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ডের পর সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ গত মাসের ৯ তারিখে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছিল তাদের বন্দরে হাইড্রোজেন পারক্সাইডের মজুদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং তাই এর ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।
সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, আপাতত বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমার মধ্যে বিপজ্জনক কার্গো রাখতে, ট্রান্সশিপমেন্ট স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কন্টেইনার গ্রহণ বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনা জারি করেছে।
‘সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করেনি এবং একইভাবে বন্দরে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের নতুন কন্টেইনারও গ্রহণ করা হয়নি।’
সভায় শিপিং এজেন্টরা বলেন, সিঙ্গাপুরের পরিবর্তে আঞ্চলিক অন্যান্য ট্রানশিপমেন্ট পোর্ট যেমন পোর্ট কেলাং, তানজুং পেলেপাস ও কলম্বো দিয়ে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বহন করা তাদের জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ও জাহাজের উপস্থিতি বিবেচনায় উপযোগী নয়।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানসম্পন্ন প্যাকিং না করায় অতীতে বিভিন্ন বিদেশি বন্দরে কিছু ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে, কারণ সেগুলো আইএমডিজি কোড মেনে প্যাকিং করা হয়নি। যদি রপ্তানিকারকরা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সঠিকভাবে প্যাকিং করে এবং সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তবে আমরা অবশ্যই রাসায়নিক বহন করব।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ প্রধানত ভারত, পাকিস্তান এবং ভিয়েতনামে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি করে যেখানে অন্যান্য ট্রান্সশিপমেন্ট রুটের পরিবর্তে সিঙ্গাপুর থেকে কার্গো পাঠানো সম্ভব।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মুনতাসির রুবায়ত বলেন, যেহেতু শিপিং লাইনগুলো সীমাবদ্ধতার কারণে সিঙ্গাপুর বন্দরে হাইড্রোজেন পারক্সাইডবোঝাই কন্টেইনার আনলোড করতে পারবে না, তাই তারা এখন রাসায়নিক বহন করছে না।
এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে জাহাজ চলাচল করে তারা সিঙ্গাপুরকে তাদের প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ধরে রাখে। করাচি বা কম্বোডিয়ার কন্টেইনারগুলো পোর্ট কেলাং বা কলম্বোর মাধ্যমে পুনরায় চলাচল করতে পারে না কারণ সেখান থেকে গন্তব্যে কোনো শিপিং পরিষেবা নেই বলেও জানান তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তফা কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানিতে সিঙ্গাপুরের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৪টি দেশে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি হয়। ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ আফ্রিকায় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি করে আয় হয় ২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।
হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মূলত বস্ত্রসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা হয়। যেসব দেশে বস্ত্র কারখানা বেশি, সেখানেই মূলত রপ্তানি করেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। দেশে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উৎপাদন করে ৬টি কারখানা। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দেশে ব্যবহার হয়। পাশাপাশি রপ্তানিও হয়। সরকার রপ্তানিতে নগদ সহায়তাও দেয়।
