চার ভাই-বোনের মধ্যে বুলবুল আহমেদ সবার ছোট। অভাবের পরিবারে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা করত মেধাবী বুলবুল। স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেওয়ার। কিন্তু দুর্বৃত্তের ছুরি সব স্বপ্ন কেড়ে নিল। ছেলে বাড়ি ফিরল লাশ হয়ে।
নরসিংদীর শহরের ভেলানগর এলাকার চৌচালা আধপাকা টিনের ঘর। জীর্ণ সেই ঘরে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। তাই বারান্দার চালায় পলিথিন দিয়ে সেই ঘরে স্বপ্ন বুনেছিল এক মেধাবী তরুণ। মেধাবী শিক্ষার্থী বুলবুল ২০১৬ সালে নরসিংদী সদরের কালিকুমার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০১৮ সালে আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। একই বছর ডিসেম্বরে মেধাবী শিক্ষার্থী বুলবুল আহমেদ ভর্তি হন দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র বুলবুল গত ৭ মাস আগে বাবা ওয়াহাব মিয়াকে হারিয়েছেন।
দু ভাই ও দু বোনের মধ্যে সবার ছোট বুলবুল। একমাত্র বড় ভাইয়ের বেসরকারি চাকরি, বোনের অনলাইন পণ্য বিক্রি ও বুলবুলের টিউশনির টাকায় চলত তাদের ৫ সদস্যের সংগ্রামী জীবন। স্বপ্ন ছিল বুলবুল বিসিএস ক্যাডার হবেন। হাল ধরবেন নিম্নবিত্ত এই সংসারের।
মা ইয়াসমিন বেগমের কাছে সোমবারই নতুন জুতা কেনার টাকা চেয়েছিল বুলবুল। নিম্নবিত্ত মা সেই শখ পূরণ করতে পারেননি। বারবার আফসোস করে একই কথা বলছেন তিনি।
নিহত বুলবুলের মা ইয়াসমিন বেগম বলেন, ছোট থেকে খুব কষ্ট করে বুলবুল লেখাপড়া করেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর সে আমার একমাত্র সম্বল ছিল। সে আমাকে বলেছে, আর মাত্র এক বছর পর আমার পড়ালেখা শেষ হয়ে যাবে। আমি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে পরিবারের হাল ধরব। কিন্তু আমার এ ফেরেশতার মতো ছেলেকে তার ক্যাম্পাসেই নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলে হত্যার বিচার চাই।
নিহত বুলবুলের বড় বোন সোহাগী আক্তার বলেন, আমার ছোট ভাই বুলবুল ছিল একটা হিরার টুকরা ছেলে। সে সব পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছিল। মেধাবী ছাত্র হওয়ায় বহু বৃত্তি পেয়েছে। বর্তমানেও কয়েকটি বৃত্তি চলমান ছিল তার। তার আরও যা খরচ ছিল, সেসব অনলাইনে কাপড় বেচে বহন করতাম আমি। আমাদের সবার স্বপ্ন ছিল, বুলবুল একজন বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারের হাল ধরবে।
ছিনতাইকারীরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি পরিবারের। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি তাদের।
বুলবুল হত্যার প্রতিবাদে চিনিশপুরে মানববন্ধন করেছে স্থানীয়রা। রাজিব নামে স্থানীয় একজন বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখেছি সে খুব কষ্টের সঙ্গে পড়ালেখা করেছে। তাকে নিয়ে পরিবারের খুব আশা ছিল। কিন্তু সেই আশা চোখের পলকে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে শেষ হয়ে গেল। আমরা অবিলম্বে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
বুলবুলের বন্ধু রায়হান বলেন, ছোট বেলা থেকে আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। সে খুব ভালো মানুষ ছিল। কারো সঙ্গেই কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। কিন্তু যখন ফোনে শোনলাম বুলবুল মারা গেছে তখন আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। যদিও বলা হচ্ছে তাকে ছিনতাইকারীরা হত্যা করেছে, কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা চাই অবিলম্বে হত্যার কারণ খুঁজে বের করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসুক।
চিনিশপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মেহেদি হাসান তুহিন বলেন, গত ৭ মাস আগে মারা যান বুলবুলের বাবা ওয়াহাব মিয়া। তারপর একমাত্র বড় ভাইয়ের বেসরকারি চাকরি ও বুলবুলের টিউশনির টাকায় চলত তাদের ৫ সদস্যের নিম্নবিত্ত সংসার। মেধাবী ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন।
এদিকে নিহত শিক্ষার্থী বুলবুলের মরদেহ নিয়ে তার বড় ভাই জাকারিয়া সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর ভেলানগরে পৌঁছান। রাতে স্থানীয় ভেলানগর ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা শেষে মাধবদী পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের সঙ্গে তাকে সমাহিত করা হবে।
