ভারতের উষ্ণ আবহাওয়া ঝামেলায় ফেলে ব্রিটিশদের। সমস্যা সমাধানে নিয়োগ দেওয়া হয় পাখাওয়ালাদের, যাদের কাজ নিজেরা না ঘুমিয়ে ব্রিটিশ প্রভুদের ঘুম পাড়ানো। কেমন ছিল পাখাওয়ালাদের প্রতি ব্রিটিশদের আচরণ? লন্ডনে তীব্র দাবদাহের সময় ব্রিটিশদের কি পাখাওয়ালাদের কথা মনে পড়ে? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
ঘুমের দফারফা
দিনভর কাজের চাপ ও ব্যস্ততা শেষে ঘরে ফিরে পরিশ্রান্ত মানুষ চায় শান্তিতে ঘুমাতে। বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ঘুমে চোখ বুজে যায়। আবার কেউ কেউ অনেক ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও বিছানায় এপাশ-ওপাশ ফেরেন, ঘড়ির কাঁটা দেখেন একটু পরপর কিন্তু রাত যত বাড়ে ঘুম ততই তাদের কাছে অধরা থেকে যায়। ঠিক সময়ে ঘুম না এলে বা কম ঘুমালে অবসন্ন হয়ে পড়ে শরীর। এভাবে টানা দিনের পর দিন ঘুম না আসাকে চিকিৎসা শাস্ত্রে ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা বলে। এটি এ সময়ে বেশ প্রচলিত এক শব্দ। মানসিকসহ বিভিন্ন কারণে এই রোগ হতে পারে। তবে এমন একসময় ছিল যখন মানসিক সমস্যার কারণে মানুষের ঘুম হারাম হতো, তা নয়। অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া ও মশার কামড়ের কারণে কিছু ব্যক্তির ঘুমাতে সমস্যা হতো। এই ব্যক্তিরা আর কেউ নন, সুদূর পশ্চিমের শীতপ্রধান দেশ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ লুটপাট করতে আসা ব্রিটিশরা।
ভারতে ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় সেটলার বা বসতি স্থাপনকারীরা বছরে বলতে গেলে অর্ধেকটা সময় ভালোভাবে ঘুমাতে পারত না কারণ সে সময় ভারতের সব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। মূলত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত গরমের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত হতো তাদের। গ্রীষ্মের তপ্ত আবহাওয়া, মশা-মাছির উৎপাত, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ তীব্র বেগে ধেয়ে আসা ধুলোঝড় তাদের অনিদ্রার জন্য প্রধানত দায়ী ছিল। এ কারণে ব্রিটিশদের হরহামেশাই ভারতের আবহাওয়া নিয়ে নালিশ করতে দেখা যেত। না, এই নালিশ তারা তাদের রানীর কাছে নয়, ঈশ্বরের কাছে করতেন। ব্রিটিশরা জানতেন, রানীর কাছে ‘অসভ্য’ আবহাওয়া নিয়ে অভিযোগ জানালে কোনো লাভ নেই, তিনি কিছু করতে পারবেন না। একমাত্র ঈশ্বরই তাদের অনিদ্রা, ভ্যাপসা গরমে গা থেকে দরদর করে ঝড়তে থাকা ঘাম ও ঘামাচির যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে পারেন।
গরমে নাজেহাল ব্রিটিশ
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো শুরু থেকে বেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আমলাদের কাজে পেশাদারির ছাপ ছিল স্পষ্ট। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব কাজ হতো। তবে বৈদ্যুতিক পাখার অভাবে রাতের বেলায় ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ঘুম ভালো না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ত পরদিন তাদের কাজে। আধা খেঁচড়া ঘুমের কারণে সকালে উঠতে দেরি হতো এবং অফিসে ঠিক সময়ে পৌঁছানো যেত না। এ ছাড়া টানা ৭-৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম না হওয়ার কারণে ব্রিটিশদের মেজাজও থাকত খিটখিটে। অবসন্ন শরীর নিয়ে কাজ করতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হতো তাদের। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি শহরগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও সব সরকারি ও বেসরকারি (ধর্মপ্রচারক) শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের ওইসব এলাকায় পাঠানো হয়নি। তাদের গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার উত্তর ভারতসহ অন্যান্য অঞ্চলে অনিদ্রায় রাত কাটাতে হতো। ঈশ্বরের কাছে অনেক আবেদন-নিবেদন করে নিরাশ ব্রিটিশরা একপর্যায়ে নিজেরাই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হন। দ্বারস্থ হন কড়িকাঠে ঝোলানো পাখার।
শোষণের যন্ত্র পাখা
গবেষক রিতম সেনগুপ্ত তার এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানান, গরমের হাত থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে ঘরের কড়িকাঠে কাপড় ঝুলিয়ে দিত ভারতীয়রা। এই চল ছিল ব্রিটিশরা ভারতে আসার আগে থেকেই। সেই কাপড়ে মৃদু দোল দিলে শরীরে বাতাস লাগত, অনেকটা হাতপাখার মতো। তবে এই প্রচলন পরে ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভিন্ন রূপ নেয়। ভ্যাপসা গরমে যাতে অনিদ্রায় রাত কাটাতে না হয় এবং অফিসে ভালোভাবে কাজ করা যায়, এজন্য ভারতীয়দের প্রাচীন আমলের ঘর ঠাণ্ডা রাখার যন্ত্র কড়িকাঠের পাখার নিষ্ঠুর ব্যবহার শুরু করে ব্রিটিশরা। এ ধরনের পাখায় ছিদ্রযুক্ত নানা ধরনের কাপড় ব্যবহার করা হতো। দড়িযুক্ত পাখা টানতে ডাক পড়ত ভারতীয় ভৃত্যের। তাদের পাখাওয়ালা বলা হতো। পাখাওয়ালাদের কাজ ছিল সারা দিন-রাত একটানা পাখা টেনে যাওয়া। শুধু ভোরবেলা ও সন্ধ্যার দিকে তারা একটু বিশ্রাম নেওয়ার অনুমতি পেতেন, কারণ ওই সময় তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকত। প্রভুদের দিনে প্রশান্তি আর রাতে ঘুম পাড়ানোর বিনিময়ে তারা মাসে পেতেন তিন রুপি। ব্রিটিশ আমলে আদালত, সেনানিবাস, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, স্কুল থেকে শুরু করে নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, অভিজাত শ্রেণির বাড়িঘরে এ ধরনের পাখা ও পাখাওয়ালাদের দেখা যেত। পাখাওয়ালারা সে সময় ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা কায়েমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন কারণ তারা না থাকলে কে ভ্যাপসা গরমে ব্রিটিশ প্রভুদের ঘুম পাড়াত এবং তাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখত? শ্বেতাঙ্গ মনিবদের পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও তার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটত? গবেষক রিতম সেনগুপ্ত তার ওই গবেষণা প্রতিবেদনে গার্হস্থ্য শ্রম, ঔপনিবেশিক শোষণ ও পাখাওয়ালাদের প্রতি ব্রিটিশদের রূঢ় আচরণের বিষয়ে আলোচনা করেন। যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ অরুণ কুমার এ নিয়ে আরও গবেষণা করেন। তার গবেষণার বিষয় ব্রিটিশদের শয়নকক্ষ ও তাদের ঘুমের সময়। অরুণ কুমারের গবেষণায় উঠে আসে পাখাওয়ালাদের ওপর ব্রিটিশদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিত্র।
গবেষক অরুণ জানান, ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা তিনি ব্রিটিশ বা ভারতীয় যেই হোন না কেন, গ্রীষ্মকালে রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তেন। যুক্তরাজ্যে পরিবারের কাছে চিঠি লিখতে গিয়ে বা অফিসের টুকিটাকি কাজ করতে গিয়ে শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের ঘুমাতে মাঝেমধ্যে দেরি হয়ে যেত। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় উত্তর প্রদেশের ফতেহগড় শহরে থাকতেন র্যাশেল জনসন নামে ব্রিটিশ এক নারী। যুক্তরাজ্যে বাবা-মার কাছে নিয়মিত চিঠি লিখতেন তিনি। এপ্রিল মাসে লেখা এমনই এক চিঠিতে জনসন বলেছিলেন, ‘তোমাদের বলার মতো নতুন কোনো সংবাদ নেই। শুধু একটিই আনন্দের সংবাদ আছে। আমার মেয়ের দুটি নতুন দাঁত উঠেছে। তার এখন সব মিলে ছয়টি দাঁত। সে এখন পাখার নিচে হাত-পা ছড়িয়ে তার ছোট্ট বিছানায় আরামে ঘুমাচ্ছে। আমার মেয়ে এখন প্রতিদিন সকালে বাথটাবে গোসল করে। বাথটাবে থাকতেই সে বেশি পছন্দ করে, সেখান থেকে উঠতে চায় না। এখানে গরম আবহাওয়ায় বাথটাবের পানিতে বেশ আরাম লাগে তার। গত বছরের গ্রীষ্ম মৌসুমে মাত্রাতিরিক্ত গরমে কখনো কখনো মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যেত। গরমে অনেক ঘেমে গেলে গোসল করতে ইচ্ছে করত এবং তাই করতাম। এতে আমার শরীর ঠাণ্ডা হতো এবং আমি আরামে ঘুমাতে পারতাম। তোমাদের শেষ চিঠি লেখার সময় আমরা বাড়ির ওপরের তলায় থাকতাম। সে সময় বেশ কয়েকবার ধুলোঝড় ওঠে। তখন আমাদের মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে নিচের তলায় নেমে আসতে হয়। এই ধুলোঝড় খুব বাজে, চোখ খুলে রাখা যায় না। এখন কয়েক মাস মাঝেমধ্যেই ধুলোঝড় উঠবে। তাই আমরা এখন নিচের তলায় আছি। বাইরের এক সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলায় ওঠা যায়।’
জনসন ও তার পরিবার সাধারণত রাত ৯টার আগে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে প্রতিবেশী ইউরোপীয় কোনো পরিবারে নৈশভোজের দাওয়াত থাকলে ঘুমাতে দেরি হয়ে যায় তাদের। বাচ্চার কারণে জনসনের ঘুম কম হওয়ায় একপর্যায়ে বাড়িতে স্থায়ী এক ভারতীয় ভৃত্য রাখেন তিনি। এই ভৃত্যের কাজ পাখা টেনে ঘরের তাপমাত্রা কম রাখার পাশাপাশি মশা-মাছিসহ অন্য পোকামাকড় দূর করা। গবেষক অরুণ কুমার জানান, পাখাওয়ালারা ব্রিটিশ আমলে ভারতের অনেক কম মজুরির শ্রমিক ছিলেন। তারা সারা রাত গরমের মধ্যে ঘেমে পাখা টেনে তাদের প্রভুদের নিরুপদ্রব ঘুমের ব্যবস্থা করতেন। জনসনের এক চিঠির লাইন এমন ‘পাখার নিচে আমি লিখি, পড়ি, খাই, ঘুমাই আর সেলাই করি’।
জনসন নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির নারী। তার স্বামী একজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক। ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে যুক্তরাজ্য থেকে স্ত্রীসহ ভারতে পাড়ি দেন তিনি। নিম্নমধ্যবিত্ত হওয়ায় তার পক্ষে দুজন পাখাওয়ালা রাখা সম্ভব নয়। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা সাধারণত দিন ও রাতের বেলায় ঘরের তাপমাত্রা কমাতে কমপক্ষে দুজন পাখাওয়ালা রাখত। পাখাওয়ালারা জীবদ্দশাতেই মৃত্যুর স্বাদ পেতেন। তাদের বিশ্রামের জন্য যে সময় বরাদ্দ ছিল, তা পর্যাপ্ত নয়। ঠিকমতো ঘুমাতে না পেরে এবং একটানা কাজ করে যাওয়ায় তাদের দশা হতো অর্ধমৃতের মতো। শ্বেতাঙ্গ প্রভু ঘুমিয়ে পড়ার পর যদি পাখাওয়ালা পাখা টানা থামিয়ে ভুল করে ঘুমিয়ে পড়তেন, তাহলে আর রক্ষা ছিল না! কারণ ওই সময়ের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ প্রভুর গরমে, ঘামে ঘুম ভেঙে যেত আর পাখা বন্ধ দেখে তার ব্রহ্মতালু রাগে জ্বলত। প্রভু ক্ষিপ্রগতিতে শয়নকক্ষ থেকে বের হয়ে পাশে পাখা টানার ঘরে গিয়ে যখন দেখতেন, পাখাওয়ালা ঠাণ্ডা মার্বেলের মেঝেতে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন, তখন তিনি প্রথমে পাখাওয়ালাকে কষে লাথি মারতেন। এরপর চলত চড়-থাপ্পড় মারার পালা। লাথি বা চড়ের সঙ্গে পাখাওয়ালাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিতে অবশ্য কখনোই ভুলতেন না শ্বেতাঙ্গ প্রভু। এ ছাড়া দিনে বা রাতে কখনো পাখা থেমে গেলে অনেক সময় ত্যক্ত-বিরক্ত প্রভু বিছানার পাশে রাখা পানির গ্লাস থেকে পাখাওয়ালার মুখে পানিও ছুড়ে মারতেন। আবার কখনো কখনো পানিভর্তি মাটির বোতল পাখাওয়ালার মাথায় ভাঙা হতো। পান থেকে চুন খসলেই পাখাওয়ালাদের বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিতে কার্পণ্য করতেন না শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা। ভারতে গ্রীষ্ম মৌসুমে অনেক ‘কষ্ট’ করে থাকতেন ব্রিটিশরা; বিশাল ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন তো চাট্টিখানি কথা নয়। এই উপমহাদেশের মানুষদের ‘সভ্য’ ও ‘উদ্ধার’ করতে এসে তাদের গরম সহ্য করে থাকতে হতো, এজন্য পাখাওয়ালার ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন হতেই পারে! নিজেরা ভালোভাবে না ঘুমিয়ে প্রভুদের নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের বন্দোবস্ত করে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের পথ মসৃণ করতেন পাখাওয়ালারা। পাখায় লাগানো দড়ির টানে প্রবাহিত বাতাসের বেগ এক রকম ছিল না এবং সেগুলোকে ভিন্ন নামে ডাকা হতো। পাখাওয়ালা যেদিকে বসতেন, সে অংশের বাতাসকে বলা হতো বোম্বে সাইড ও অপর অংশের বাতাসকে বলা হতো বেঙ্গল সাইড। ব্রিটিশদের এই গালভরা নামকরণ আবহাওয়ার গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মৌসুমি বায়ু যখন ভারতের পশ্চিম উপকূলীয় শহর বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই) প্রবেশ করে, তখন বাতাসের গতি থাকে সর্বোচ্চ। এই মৌসুমি বায়ু যত পশ্চিমবঙ্গের দিকে অগ্রসর হয়, ততই এটির গতি ধীর হয়ে যায়।
নির্যাতনের নিষ্ঠুর তরিকা
পাখাওয়ালাদের ওপর বিভিন্ন পদ্ধতিতে অকথ্য নির্যাতন চালাত সব শ্রেণির ব্রিটিশ। নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির র্যাশেল জনসনের স্বামী ধর্মপ্রচারক হওয়া সত্ত্বেও তাদের হাতেও পাখাওয়ালারা নির্যাতনের শিকার হতেন। এক চিঠিতে জনসন তাদের পাখাওয়ালা সম্পর্কে বাবা-মাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের বয়স্ক পাখাওয়ালার চুল একটি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। সে ঘুমিয়ে পড়ে পাখা টানা বন্ধ করলে আমরা তার চুলের দড়িতে টান দিই। পাখাওয়ালার চুল দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার সুবিধা হলো তার ঘুম পেলেও সে সতর্ক থাকবে, সহজে ঘুমাবে না।’ এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করা ব্রিটিশ নীলকর ও চা বাগানের মালিকরা পাখাওয়ালাদের ওপর ভয়ংকর নির্যাতন চালাতেন। পাখাওয়ালাদের জন্য তারা বিশেষ ধরনের কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছিলেন। পাখাওয়ালারা যেখানে বসে পাখা টানতেন, সেখানে চিনি ছিটিয়ে দিত সাহেবরা, যাতে পাখাওয়ালারা ঘুমিয়ে পড়লে পিঁপড়া তাদের ঘর্মাক্ত দেহে কামড় দেয় এবং জাগিয়ে তোলে। নীলকর ও চা বাগানের মালিকদের অত্যাচারের আরেক তরিকা ছিল পাখাওয়ালাদের হাতের নিচে জ্যান্ত হাঁস রেখে দেয়া। পাখা চালানোর সময় ওই হাঁস যদি পাখাওয়ালার কাছ থেকে দূরে চলে যায়, তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হতো।
লন্ডনে দাবদাহ
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে চলতি মাসে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। যুক্তরাজ্যের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ায়। এটি ছিল দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। ইতিহাসবিদেরা প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের উষ্ণ আবহাওয়া একসময় সহ্য হতো না ব্রিটিশ শাসকদের। কম মজুরিতে বাড়িঘর, অফিস-আদালতে তারা ভারতীয় ভৃত্যদের দিয়ে পাখা টানিয়ে নিজেদের শীতল করত। বোনাস হিসেবে ভৃত্যদের কপালে জুটত নির্যাতন-নিপীড়ন, অকথ্য গালাগালি। আজ যুক্তরাজ্যের তাপমাত্রা সেই সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ইউরোপীয়রা এখন এই উষ্ণ আবহাওয়া সহ্য করছে কীভাবে? পূর্বপুরুষদের মতো তারাও কি পাখাওয়ালাদের অভাব বোধ করছেন?
