তাবিজ বানিয়ে চলে ৭০০ পরিবার

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২২, ১২:০৪ এএম

গ্রামের ভেতর প্রবেশ করতেই ঘরগুলো থেকে ভেসে আসছিল খটখট শব্দ। টিন অথবা লোহায় হাতুড়ি পেটা করলে যে রকম শব্দ হয়। একেবারে কাছে গিয়ে না দেখলে আন্দাজ করার উপায় নেই যে এটা তাবিজ বানানোর শব্দ। এভাবে গ্রামের সবাই তাবিজ বানানোতে ব্যস্ত থাকবে এটা হয়তো কারও কল্পনায় অত সহজে আসবে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুশুরী, দক্ষিণবাগ ও ভিংরাবো গ্রামের চিত্র এমনটাই। তিনটি গ্রাম নিয়ে এই তাবিজপল্লির প্রায় ৭০০ পরিবার তাবিজ বানিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছে। তাবিজ সাধারণত ঝাড়ফুঁকসহ বিভিন্ন কাজে লেগে থাকে। বাপ-দাদার ২০০ বছরের পুরনো এ পেশাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মাসে একেকটি পরিবার প্রায় ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার তাবিজ তৈরি করেন। এসব তাবিজের আবার বিভিন্ন আঞ্চলিক নামও রয়েছে। যেমন সাম্বু, বাম্বু, পাই, বড় মাজলা, ছোট মাজলা, মস্তুলসহ প্রায় অর্ধশত নাম। লোহার তাবিজের মূল্য সবচেয়ে কম। এ ছাড়া পিতল, রুপা ও স্ব^র্ণের তাবিজ আলাদা অর্ডারের মাধ্যমে তৈরি করেন তারা। তাবিজ বিক্রি করা হয় হাজার অথবা শতক হিসাবে। তিন গ্রামের বাসিন্দারা প্রতি মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকার তাবিজ তৈরি করেন। এসব তাবিজ বিভিন্ন জেলা-উপজেলাসহ বিদেশেও রপ্তানি হয়; বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভারতে তাবিজের চাহিদা রয়েছে। লাভজনক হওয়ায় নতুন নতুন অনেক পরিবার এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও তাবিজ তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এমনকি শিশু-কিশোররাও কাজে সহায়তা করছে। কেউ তাবিজ তৈরির কাঁচামাল প্রস্তুত করছেন, কেউ আবার আগুনে দিয়ে তাবিজ প্রস্তুত করছেন।

গৃহবধূ শিরিনা বেগম বলেন, ‘ঘরের কাজের পাশাপাশি অবসর সময়ে তাবিজ তৈরি করি। এতে করে সংসারে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে।’

শত বছর বয়সী তাবিজ কারিগর শৈতা রানী দাস বলেন, ‘আমার শ^শুর-শাশুড়ি এ তাবিজ বানাইত, এহন আমিও ওনাগো কাজটা ধইরা রাখছি। আমার পোলা-মাইয়া, নাতি-নাতনিরেও কইছি তোমরা এই তাবিজ বানানের কাজ ধইরা রাখবা।’

তাবিজ কারিগর নুরুল হক বলেন, ‘আমাদের তৈরি তাবিজ কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যায়। প্রতি মাসের শেষের দিকে আসে তারা। কখনো কখনো আমরাও নরসিংদী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন হাটে গিয়ে তাবিজ বিক্রি করে আসি।’

শহিদুল ইসলাম নামে অন্য এক কারিগর বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে আমাদের বাপ-দাদারা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমরাও তাদের অনুসরণ করছি। তাবিজের দাম হিসেবে এর খরচ বর্তমানে অনেকটা বেশি। পুঁজির অভাবে আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছি না। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ পেলে এ পেশাটাকে আরও লাভজনক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ্ নূসরাত জাহান বলেন, ‘তিনটি গ্রামের অনেকেই তাবিজ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন শুনেছি। তাবিজ তৈরির শিল্পটা টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের সঙ্গে কথা বলব। তাদের কী কী সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়, সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত