বর্ধমান আমদানি ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বেশি করে ডলার কেনায় ব্যাংকগুলোতে টাকার টানাটানি শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানি মার্কেট) থেকে এক দিনের জন্য ৯ হাজার ৮১০ কোটি ২০ লাখ টাকা ধার করেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যা গত সাড়ে ৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন।
এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি কলমানি মার্কেট থেকে এক দিনের জন্য ৯ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা ধার করে ব্যাংকগুলো। গত রোজা ও কোরবানির ঈদের আগে কলমানির লেনদেন বাড়লেও তা ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নিচে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১ আগস্ট কলমানির এক দিনের লেনদেন ৬ হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়ায়। ৩ আগস্ট ৭ হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়ায় কলমানির লেনদেন। ৪ আগস্ট এই লেনদেন ৮ হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়ায়। অর্থাৎ প্রায় প্রতিদিনই এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন বেড়েছে কলমানি মার্কেটে।
যা এর আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ৫ হাজার কোটি টাকার নিচে। তবে জুলাই মাসের ১০ তারিখ কোরবানির ঈদ পালিত হওয়ায় ওই মাসের ৫ তারিখে কলমানির লেনদেন বেড়ে ৯ হাজার ৫২৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমদানি প্রবৃদ্ধি বেশি থাকায় ব্যাংকগুলোকে প্রচুর ডলার কিনতে হচ্ছে। ফলে নগদ টাকা আমদানির পেছনে ব্যয় হলেও তা ঋণ হিসেবে আমদানিকারকদের কাছে পাওনা থাকছে। ফলে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য কমে আসছে।
গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর কাছে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা।
গত ৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, ‘গত এক বছরের ৭৫০ কোটি ডলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করেছি। এভাবে ডলার বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ৭৮ হাজার কোটি টাকা উঠে এসেছে। এমনিতেই টাকার সরবরাহ কম। তারপর এত টাকা উঠে আসছে তারল্য আরও চাপে পড়ে।’
ব্যাংকের তারল্যের এই চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোতে টাকা সরবরাহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে দেখা করতে এসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ব্যাংকঋণের সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে না দিয়ে বাজারে ‘মানি সাপ্লাই’ বাড়াতে হবে। ঋণের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিলে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।’
করোনা মহামারী কিছুটা কমে আসায় গত অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সারা বিশ্বেই জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য মজুদের প্রবণতা বেড়ে গেলে পণ্যমূল্য উচ্চ হারে বাড়তে শুরু করে, যা আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে তোলে। বর্ধমান এই আমদানি ব্যয় দেশের ডলারের বাজার অস্থির করে তোলে। চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কেনা বাড়িয়ে দেয় ব্যাংকগুলো।
এদিকে কলমানি মার্কেটে চাপ বাড়ায় সম্প্রতি এর সুদের হারও বেড়েছে। গত এক মাস ধরে এক দিনের কলমানি মার্কেটে সর্বোচ্চ সুদ ৬ শতাংশ বজায় রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরের পুরো সময়ে পণ্য আমদানি ব্যয় ৩৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৯২৫ কোটি ডলারে পৌঁছায়। আমদানি ব্যয় থেকে রপ্তানি আয় বাদ দিলে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
তা ছাড়া গত জুন মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গত ৪৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোতে এখন ঋণ বিতরণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
