বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দুই ধরনের লোভী কখনো তৃপ্ত হয় না। ১. জ্ঞানলোভী যে জ্ঞানার্জনে কখনো তৃপ্ত হয় না, ২. দুনিয়ালোভী, যে ধন-সম্পদ অর্জনে কখনো তৃপ্ত হয় না।’ -মুসতাদরাক হাকেম : ৩১২
বর্ণিত হাদিসে দুইটি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ১. যারা প্রকৃত জ্ঞানী তাদের জ্ঞান লাভের তৃষ্ণা কখনো মিটবে না, ২. যারা দুনিয়া উপার্জনকারী তাদের দুনিয়ার ধন-সম্পদ উপার্জনের তৃষ্ণা জীবনে মিটবে না।
হাদিসের শেষাংশে বলা হয়েছে, যারা ইলম অর্জন থেকে দূরে থাকবে, দুনিয়া তাদের পেয়ে বসবে, তারা দুনিয়ার সামগ্রী অর্জনের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করতে থাকবে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের দুনিয়া উপার্জন থেকে আলাদা করা যাবে না। অর্থাৎ সম্পদ উপার্জন করতে করতে কবর পর্যন্ত যাবে। কোরআন মাজিদে বিষয়টি এভাবে বলা হয়েছে, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে। যতক্ষণ না তোমরা কবরের সাক্ষাৎ করবে।’ -সুরা তাকাসুর : ১-২
যারা দুনিয়ার লোভে ছুটবে, জীবনকে পরিবর্তনের স্রোতের গড্ডলিকার প্রবাহে ভাসিয়ে দেবে তাদের জন্য পরকালে কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করছে। তাদের পরিণতি প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘কখনো নয়, শিগগিরই তোমরা জানবে, তারপর কখনো নয়, তোমরা শিগগিরই জানতে পারবে। কখনো নয়, তোমরা যদি নিশ্চিত জ্ঞানে জানতে! তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে; তারপর তোমরা তা নিশ্চিত চাক্ষুষ দেখবে। তারপর সেদিন অবশ্যই তোমরা নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ -সুরা তাকাসুর : ৩-৮
আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার সম্পদ উপার্জন করতে নিষেধ করেননি, বরং প্রয়োজন মেটানোর জন্য যতটুকু দরকার তা উপার্জনের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আর আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ -সুরা জুমআ : ১০
অন্য আয়াতে দয়াময় আল্লাহ বলছেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তাতে তুমি আখেরাতের নিবাস অনুসন্ধান করো। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো।’ -সুরা কাসাস : ৭৭
সম্পদ উপার্জনের উদ্দেশ্য যদি হয় শুধু দুনিয়ায় গর্ব-অহংকার প্রকাশ এবং লোকে তাকে সম্পদশালী বলবে তাহলে এই সম্পদ তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকার জন্য, পরিবারের খরচ নির্বাহের উদ্দেশ্যে এবং প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণের লক্ষ্যে হালাল উপায়ে দুনিয়ার বৈধ সম্পদ অন্বেষণ করে সে আল্লাহর সঙ্গে কেয়ামতের দিন এমনভাবে মিলিত হবে, তার চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল থাকবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বৈধ উপায়ে মাল অর্জন করল বটে; কিন্তু গর্ব-অহংকার ও সম্পদের আধিক্য প্রকাশের নিয়তে, সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় মিলিত হবে, তিনি তার ওপর ভীষণভাবে ক্রোধান্বিত হবেন।’ -বায়হাকি
দুনিয়ার সম্পদ সন্তান-সন্ততি সবই চাকচিক্য ও ধোঁকার সরঞ্জাম মাত্র। বরং আখেরাতেই রয়েছে বান্দার জন্য সবচেয়ে বড় সফলতা। কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা সে কথাই বুঝাতে চেয়েছেন। ‘তোমরা জেনে রাখো যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা বৃষ্টির মতো, যা কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখেরাতে আছে কঠিন আজাব।’ -সুরা হাদিদ : ২০
একজন বান্দা তার জীবনে তাই উপার্জন করবে, যা পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে তার তাকদিরে লেখা হয়েছে। শত চেষ্টা করেও এর অতিরিক্ত উপার্জন করতে পারবে না। এই ধারণা যার অন্তরে বদ্ধমূল রয়েছে, সে কখনো দুনিয়ায় অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যতিব্যস্ত হবে না। পক্ষান্তরে যার অন্তরে পরকালীন জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই, সে শুধু দুনিয়া লাভের জন্য ব্যস্ত থাকবে, এর থেকে সে আলাদা হতে পারবে না।
হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে লোক (স্বীয় আমলে) পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত রাখে, আল্লাহ তার হৃদয়কে (মানুষ থেকে) অমুখাপেক্ষী করে দেন এবং তার অগোছালো কাজ-কর্মগুলো তিনি গুছিয়ে দেন এবং দুনিয়াবি সম্পদ তার কাছে লাঞ্ছিত হয়ে আসে। অপরদিকে যে ব্যক্তি দুনিয়া লাভের নিয়ত রাখে, আল্লাহ নিঃস্বতাকে তার চোখের সামনে করে দেন। (সে সর্বদা অভাব-অনটনকেই দেখতে পায়), তার কাজকর্ম এলোমেলো হয়ে যায়। অথচ সে ইহকালীন সম্পদের কেবল ততটুকুই পায় যতটুকু তার জন্য ধার্য রয়েছে।’ -জামে তিরমিজি
মানুষ দুনিয়ার সম্পদ লাভের জন্য সর্বদা ব্যস্ত থাকে অথচ দুনিয়ার সব সম্পদ এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত। তবে যেখানে আল্লাহর স্মরণ আছে, দ্বীনি ইলম আছে সেটা অভিশপ্ত নয়। এ সম্পর্কে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সব অভিশপ্ত তবে আল্লাহর জিকির এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহায়ক অপরাপর আমল, আলেম এবং তালেবে ইলম (জ্ঞানার্জনকারী, শিক্ষার্থী) ছাড়া।’ -জামে তিরমিজি
