আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। হাতির আবাসস্থল ও পরিবেশ টেকসই, তাদের খাদ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত এবং হাতি চলাচলের করিডোর উম্মুক্ত করতে দিবসটিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারে দিবসটি পালন করছে বিভিন্ন সংগঠন।
আবাসস্থল ধ্বংস, করিডোর বন্ধসহ নানা কারণে সংকটাপন্ন এ বন্য হাতি রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার উপর গুরুত্বারোপ করছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের বিশাল বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর থেকে বন্য হাতির খাদ্য ও চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে মানুষের সঙ্গে হাতির দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশে পালিত হয়ে আসলেও হাতি রক্ষায় কার্যত উদ্যোগ নেই। প্রতিনিয়ত হাতির আবাসস্থল ধ্বংস, করিডোর বন্ধসহ নানা কারণে কক্সবাজার ও পার্বত্য বনাঞ্চলে সংকটাপন্ন অবস্থায় বন্যহাতি। বিশাল বনাঞ্চল জুড়ে রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠায় ঘুমধুম হাতির করিডোর সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তাই, দেশে যে অবশিষ্টি এশিয়ান হাতি রয়েছে, তাদের রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য আবাসস্থল, করিডোরসহ নানাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) আয়োজিত এক সেমিনারে এ তাগিদ দেওয়া হয়।
হাতি নিয়ে কাজ করছে ‘আইইউসিএন বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাকিবুল আমিন বলেন, বর্তমানে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ঘুমধুম আন্তর্জাতিক হাতির করিডোর বন্ধ রয়েছে। ফলে হাতি চলাচলের একটি বড় বাঁধা রয়েছে। সুতরাং কক্সবাজার বনাঞ্চল এলাকায় ৪০ থেকে ৪৫টি বন্য হাতির খাদ্যভাবসহ নানা কারণে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
কক্সবাজার বনবিভাগের দক্ষিণ বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম বলেন, কক্সবাজার, বান্দরবান এলাকায় ৭০ থেকে ৮০টি হাতি রয়েছে। এসব হাতি রোহিঙ্গাদের কারণে বাঁধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষ আর হাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। এছাড়া বনাঞ্চলের নানা স্থাপনা, জবর দখল, রাস্তাঘাট তৈরি হওয়ায় আবাসস্থল নষ্ট হয়ে গেছে। তাই হাতিকে পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে আবাসস্থল তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, খাদ্য ও করিডোর তৈরির কাজ চলছে। এর ফলে গত এক বছর ১৬টি হাতির বাচ্চা প্রসব হয়েছে কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন বনাঞ্চলে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, গত ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মানব-হাতি সংঘর্ষে ১২ জন রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে। মানব-হাতি সংঘর্ষ প্রশমিত করার জন্য ‘আইইউসিএন বাংলাদেশ’, ‘ইউএনএইচসিআর’ সহ বেশকিছু সংগঠনের সমন্বয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশেপাশে ‘জীব বৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য মানবিক-সংরক্ষণ কর্ম’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সালে বন বিভাগ এবং আইইউসিএনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের আবাসিক হাতির বিচরণ বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। দেশের বনাঞ্চলে আবাসিক বন্যহাতি আছে ২৬৮টি।এছাড়া দেশের সীমান্তবর্তী পাঁচটি বনাঞ্চলে ৯৩ থেকে ১০৭টি পরিযায়ী হাতির বিচরণ করে।
গবেষণায় ৯টি বিভাগীয় বন অফিসের আওতায় হাতি চলাচলের ১১টি রুট চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার মোট দৈর্ঘ্য ১৫১৮ কিলোমিটার। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে হাতির বিচরণের পথ দ্রুত কমে আসছে। গত ছয় বছরে বন্ধ হয়ে গেছে হাতি চলাচলের তিনটি করিডোর। এসব কারণে নিয়মিত চলাচলের পথ ব্যবহার করতে পারছে না হাতি। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড়ি বনাঞ্চলে ছিল বেশ কিছু হাতি চলাচলের করিডোর। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে নষ্ট হয় করিডোরগুলো।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং বান্দরবানের ঘুমধুমের সীমান্তবর্তী এলাকায় হাতি চলাচলের ১১টি করিডোর রয়েছে। এসব করিডোরের বেশিরভাগেই এখন গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার কার্যালয়। চলাচলের পথসহ হাতির অভয়ারণ্য রক্ষার পাশাপাশি জীববৈচিত্র সংরক্ষণে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন অনেকেই।
