ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৮০ লাখ টাকা যৌতুক চেয়ে না পেয়ে চার বছর ধরে মানসিক নির্যাতনের পর এবার মারধর করে চার বছর বয়সী কন্যাসহ এক গৃহবধূকে ঘরছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়; নির্যাতনের শিকার বৈশাখী চক্রবর্তী মৌ নামের ওই গৃহবধূ পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় সেইদিন প্রাণে বেঁচে এসে বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করে প্রাণনাশের হুমকিতে আছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চিকিৎসক কামনাশীষ চক্রবর্তী সেতু (৩৪)। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত।
নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ বৈশাখী চক্রবর্তী নগরীর নন্দনকানন এলাকার অরূপ ভট্টাচার্যের মেয়ে। অভিযুক্ত ডা. কামনাশীষ চক্রবর্তী সেতু পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সহকারী কমিশনার নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তীর ছেলে। তাদের গ্রামের বাড়ি বাঁশখালী হলেও বর্তমানে নগরীর মোমিন রোডের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
নির্যাতনের অভিযোগে চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ মামলা দায়ের করেছেন বৈশাখী। যার নম্বর ১৩৯/২২।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে চিকিৎসক কামনাশীষ চক্রবর্তী সেতুর সঙ্গে বৈশাখী ভট্টাচার্যের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতনের শিকার হয়ে বাবার কাছ থেকে যৌতুক আনলেও স্বামীর মন ভরেনি। সবশেষ ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৮০ লাখ টাকা যৌতুক চেয়ে দফায় দফায় নির্যাতন করা হয় তাকে। এই নির্যাতনের বিষয়ে পারিবারিক আদালতে আপসনামা দিলেও স্বামীর নির্যাতন থামেনি।
বৈশাখী ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিয়ের পর গত চার বছর ধরে শ^শুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের দাবিতে আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে আসছিল। অথচ বস্ত্রালংকার ও বিয়ের সময় কোনো যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার কথা ছিল না। যৌতুক হিসেবে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণ, ফার্নিচার, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, টেলিভিশন নিলেও তাদের মন ভরেনি। আরও লাগবে। সব সময়ই চাইত। সর্বশেষ গত ২৩ মে রাতে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৮০ লাখ টাকা দাবি করে তারা। আমার বাবাকে বিষয়টি বলতে আমাকে জোর করা হয়। রাজি না হওয়ায় আমার স্বামী ও শ^শুর আমাকে মারধর করেন। পরে আমি নিরুপায় হয়ে ৯৯৯-এ ফোন করি। ফোন পেয়ে কোতোয়ালি থানার এসআই আরাফাত আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। এর আগেও আমার শাশুড়ি শিখা চক্রবর্তী আমার চুল কেটে দিয়েছিলেন। খুন্তি দিয়ে আগুনের ছ্যাকা ও গরম পানি ঢেলে দিয়েছিলেন।’
বৈশাখী আরও জানান, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে এর আগে পারিবারিক আদালতেও মামলা (নম্বর-২১৫/২০) করেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে স্বামী আর নির্যাতন করবে না বলে আপসনামা দিয়ে নিজেদের দুটি বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তারা তাকে ভাড়া বাড়িতে ওঠায়। এর ২-৩ দিন পর তারা আবারও তার ওপর নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতনের বিষয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওরা মামলা নেয়নি। কারণ তার শ্বশুর পুলিশের সাবেক এএসপি। এই বিষয়ে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে অভিযোগ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ নির্যাতনের বিষয়ে চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ মামলা করেছেন। আগামী ২৪ আগস্ট সেই মামলার শুনানি হবে। কিন্তু এই মামলার পর থেকে শ^শুরবাড়ির লোকজন তাকে ও তার বাবাকে প্রতিনিয়ত মেরে ফেলার হুমকিধমকি দিচ্ছেন। এমনকি তার বাসার আশপাশে ওদের লোকজন দিয়ে তাদের পাহারায় রেখেছেন।
চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছেন জানিয়ে বৈশাখী বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছি। জীবনের নিরাপত্তা দাবি করছি এবং আমি সুষ্ঠু বিচার প্রত্যাশা করছি।’
এর আগে তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের আকুতির কথা জানিয়েছেন বলে বৈশাখী জানান।
তবে বৈশাখীকে নির্যাতনের অভিযোগ ও যৌতুকের দাবিকে ভিত্তিহীন ও অবান্তর বলে আখ্যায়িত করেছেন অভিযুক্ত ডা. কামনাশীষ চক্রবর্তী সেতু। তিনি মোবাইল ফোনে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। সেটির তদন্ত হচ্ছে। আমরা তাকে নির্যাতন করিনি, বরং বৈশাখী আমাকে ও আমার বাবা-মা’কে মেরেছে। আমার বাবার পা ভেঙে দিয়েছে। সেটার তদন্ত চলছে। আর বেশি কিছু বলতে চাই না, যা হওয়ার আদালতে হবে।’
