সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমি দখলের জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মুন্ডাদের পল্লীতে ভাড়া করা লাঠিয়ালদের দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ধুমঘাট অন্তাখালি মুন্ডাপল্লীতে চালানো ওই হামলায় তিন নারীসহ চারজন আহত হয়েছে।
হামলায় দুইশোর বেশি ভাড়া করা লাঠিয়াল অংশ নেয়, যারা মুন্ডাপল্লীটির সব পরিবারের সদস্যকে অবরুদ্ধ করে রেখে বিরোধপূর্ণ আট বিঘা জমিতে পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করে। এ সময় ওই জমিতে মুন্ডা সম্প্রদায়ের লোকজনের চাষের জমিতে বেড়ে ওঠা ধান নষ্টের পাশাপাশি তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে।
হামলায় আহতরা হলেন ফনীন্দ্র মুন্ডার স্ত্রী বিলাসী মুন্ডা (৩৬), সনাতন মুন্ডার স্ত্রী রিনা মুন্ডা (৩৫), লক্ষ্মীন্দর মুন্ডার স্ত্রী সুলতা মুন্ডা (৩৫) ও মৃত মল্লুকচান মুন্ডার ছেলে নরেন্দ্র মুন্ডা (৭০)। তাদের শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
আহত রিনার স্বামী সনাতন অভিযোগ করে বলেন, ‘স্থানীয় প্রয়াত গফুর সরদারের ছেলে রাশিদুল সরদার ও এবাদুল সরদারের নেতৃত্বে বংশীপুর থেকে আসা দুইশোর বেশি ভাড়া করা লাঠিয়াল আমাদের পল্লীতে হামলা চালায়। হামলার সঙ্গে জড়িতরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মী। দীর্ঘদিন ধরে মুন্ডা সম্প্রদায়ের ভোগদখলে থাকা জমি দখলের চেষ্টায় ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের নিয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে।’
হামলার শিকার ফনীন্দ্র অভিযোগ করে বলেন, ‘গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুই থেকে আড়াইশ সন্ত্রাসী আমাদের মুন্ডাপাড়া ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্যে একটি অংশ পল্লীর প্রতিটি পরিবারের সদস্যকে ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ করে রাখে। একই সময়ে হামলাকারীদের অন্য একটি অংশ মু-াদের ভোগদখলে থাকা আট বিঘা জমিতে পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ শুরু করে। এ সময় কয়েকজন অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে কোনোরকমে নিজেদের ছাড়িয়ে নিয়ে বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে গিয়ে জমি চাষে সন্ত্রাসীদের বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সন্ত্রাসীরা আমাদের বেধড়ক মারধর করে। মারধরে চারজন গুরুতর আহত হন। একপর্যায়ে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে হামলার খবর জানানো হয়। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় অনেক দেরিতে। আর এ সুযোগে হামলাকারীরা বিরোধপূর্ণ জমিতে চাষাবাদ শেষে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়।’
মুন্ডা সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবন আদিবাসী মহিলা সংস্থা-সামসের নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের নারকীয় তাণ্ডবের শিকার তিন নারীসহ এক পুরুষকে শ্যামনগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মুন্ডা সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অথচ স্থানীয় কিছু কুচক্রী জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জমির মালিকানা দাবি করায় বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। এমতাবস্থায় ওই জমি দখল করতে গিয়ে মুন্ডা সম্প্রদায়ের তিন নারীসহ কয়েকজনকে পিটিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। দুই শতাধিক সন্ত্রাসী মুন্ডাপল্লীতে বসবাসরত পরিবারগুলোকে অবরুদ্ধ করে রেখে বিরোধপূর্ণ আট বিঘা জমি পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা মুন্ডা সম্প্রদায়ের চাষের জমিতে বেড়ে ওঠা ধান নষ্ট করে দেয় এবং তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে।’
অবশ্য হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই ভাইয়ের একজন রাশিদুলের দাবি, তাদের জমিই মুণ্ডা সম্প্রদায়ের লোকজন অবৈধভাবে দখলে রেখেছিল। গতকাল চাষ করতে গেলে তাদের ওই জমিতে নামতে বাধা দেওয়া হয়। সেখানে কাউকে মারধর করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
শ্যামনগর থানার ওসি কাজী ওয়াহিদ মুর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামলার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা সটকে পড়ে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
