ঐতিহাসিক খরার কবলে বিশ্ব

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২২, ১২:৪২ এএম

কম বৃষ্টি এবং অতিরিক্ত তাপদাহের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের নদীগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলগুলোর অনেক নদীর পানি এতটাই কমে গেছে যে, দেখলে মনে হবে প্রবাহ কমে যাওয়া কোনো খাল। সাগরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী অনেক নদীই এখন হারিয়ে গেছে মানচিত্র থেকে। মানবসৃষ্ট এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু নদ-নদীই নয়, মানুষের জীবনযাত্রাতেও আসছে অনেক নেতিবাচক পরিবর্তন, যার জন্য মানুষ প্রস্তুত ছিল না। যেভাবেই হোক পৃথিবীর মানুষ এখনো নদ-নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। পানি খাওয়া থেকে শুরু করে শস্যে সেচ ও পণ্য সরবরাহের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নৌপথই অন্যতম ভরসা।

কলোরাডো নদী : যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমে চলমান খরা পরিস্থিতিতে প্রায় শুকিয়ে গেছে কলোরাডো নদী। অথচ এই নদীই যুগ যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পানির অন্যতম আধার হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। এই নদীর ওপর দেশটির সাতটি রাজ্য ও মেক্সিকোর চার কোটির বেশি মানুষ নির্ভরশীল। পানি সংকট থেকে বাঁচতে ওয়াশিংটন প্রশাসন ইতিমধ্যেই পানির ব্যবহারে সংকোচন নীতিমালা নেওয়াসহ বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপর জলাধার লেক মিয়েদকে সম্প্রতি মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। লেকটিতে পানির প্রবাহ এতটাই কমেছে যে, তা আর নিম্নাঞ্চলে প্রবাহিত হতে পারছে না।

ইয়াংসি নদী: এশিয়ার অন্যতম নদী ইয়াংসিও শুকিয়ে যাচ্ছে। খরার ফলে নদী শুকিয়ে নতুন নতুন অঞ্চল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। অথচ এই নদীকে কেন্দ্র করেই চীনের একাধিক অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত গড়ে উঠেছে। গত ৯ বছরে এবারই প্রথম পেইচিং সরকার দেশব্যাপী খরা সতর্কতা জারি করেছে। সিচুয়ান প্রদেশের ৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ইয়াংসি নদীর ওপর নির্ভরশীল। ওই অঞ্চলের ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎও আসে নদীটিতে অবস্থিত হাইড্রোপাওয়ার থেকে। গত ছয় দিন ধরে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। পাশাপাশি নদীসংলগ্ন অনেক কারখানা ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।

রাইন নদী: জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত রাইন নদী মিলেছে নর্থ সি’র সঙ্গে। এই নৌপথ দিয়ে গোটা ইউরোপের পণ্য সরবরাহ হয়। কিন্তু এখন নদীটির অনেক অংশ শুকিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাহাজ, বোমা ও প্রাগৈতিহাসিক পাথর বের হয়ে আসছে। রাইন নদীর বিভিন্ন অংশে ‘হাঙ্গার স্টোনের’ পুনরাবির্ভাব জার্মানির অনেকের মধ্যে আগের খরাগুলোর স্মৃতিও নিয়ে আসছে। নদীটির শুষ্কতার কারণে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটের পশ্চিমে তীব্র খরার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে নদীর পানি ৩২ সেন্টিমিটার কমে যাওয়ায় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পণ্য সরবরাহ খরচ বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আর এর চাপ পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

পো নদী: ইতালি হয়ে আদ্রিয়াটিক সাগরে ধাবিত হয়েছে পো নদী। আল্পসের বরফ গলা পানি ও বর্ষাকালের বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর থাকা পো নদী এখন গ্রীষ্ম ও বসন্তেও শুকিয়ে কাঠ। গত সাত দশকে এমন খরা দেখেনি ওই নদীসংলগ্ন মানুষ। ইতালি তাদের পো নদীর আশপাশের এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে। জুলাইয়ের শেষদিকে তারা দেশের সর্ববৃহৎ নদীটির হ্রাস পাওয়া পানিতে আধা নিমজ্জিত অবস্থায় সাড়ে চারশ কেজি ওজনের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন একটি বোমা পেয়েছিল। ইতালির খাদ্যশস্যের ৩০ শতাংশই আসে পো নদীর আশপাশ থেকে। দেশটির বিখ্যাত পার্মেসান চিজও তৈরি হয় এখানে। বলা হচ্ছে, পৃথিবীর মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।

লরি নদী: ফ্রান্সের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লরি নদী। দেশটির বিখ্যাত ওয়াইন শিল্প গড়ে উঠেছে এই নদীকে কেন্দ্র করে। ৬০০ মাইল দীর্ঘ এই নদীকে বলা হয় ফ্রান্সের শেষ বন্য নদী, যার শরীরে আছে বহু প্রাণবৈচিত্র্যের বসবাস। নদীটির একটা বড় অংশেই এখন চর পড়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এর বরফ গলে যাচ্ছে। অনেকে এখন হেঁটেও লরি নদী পাড়ি দিতে পারছে, যা এক যুগ আগেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারত না।

দানিউব নদী: পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী বলা হয় দানিউবকে। প্রায় দশটি দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নির্ভর করে নদীটির ওপর। খরা পরিস্থিতির কারণে নদীর অবস্থা এতটাই খারাপ যে, রোমানিয়া, সার্বিয়া এবং বুলগেরিয়ার শ্রমিকরা ড্রেজিং করে নদীটিকে পণ্য পরিবহনে যোগ্য রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দানিউব নদীকেন্দ্রিক পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভরশীল হাঙ্গেরি। ইতিমধ্যেই দেশটি পর্যটক কমে যাওয়ার ধাক্কা সামলাচ্ছে। হাঙ্গেরিতে পণ্যবাহী জাহাজ প্রবেশ করতে পারছে না তাদের অংশের নদী শুকিয়ে নাব্য কমে যাওয়ায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত