জ্বালানি তেল দাম কমাতে আটিয়ার প্রাণপণ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২, ০৯:৪৩ পিএম

দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সবার স্বার্থে আন্দোলনে নেমেছেন আল-আমিন আটিয়া নামের এক শিক্ষার্থী। তার দাবি জ্বালানি তেলের লিটারপ্রতি দাম ৮০ টাকার নিচে নামাতে হবে। এক সপ্তাহ ধরে এ দাবিতে তিনি একাই রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরণ অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই শিক্ষার্থী।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টায় আল-আমিনকে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আল-আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার যদি মৃত্যুও হয় তাতেও আমি আন্দোলন থেকে পিছু হটব না।’

গত ৫ আগস্ট রাত থেকে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৪২-৫২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে সরকার। লিটার প্রতি পেট্রলের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়। অকটেনের দাম বাড়ে ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করায় এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয়। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে কয়েকগুণ। দেশের জনগণের দুর্ভোগ কমাতে ব্যক্তিগত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান আল-আমিন।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ও গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে কথা হয় আল-আমিনের সঙ্গে।

আল-আমিন আটিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি বাংলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের  স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলায়। রাজধানীতে লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি অনলাইনে পণ্য ডেলিভারি দিয়ে টাকা উপার্জন করেন।

জ্বালানি তেলের দাম ৮০ টাকার নিচে নামাতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে গত ১৬ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন শুরু করেন। অনশনের ১৭০ ঘণ্টার মাথায় স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাকে দুপুর পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

সেখানে সন্ধ্যা ৬টায় দেশ রূপান্তরকে আটিয়া বলেন, গত ১৬ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত আমার আন্দোলন চলমান রয়েছে। এ অহিংস আন্দোলন সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত। রাষ্ট্রের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তেলের দাম সমন্বয় করে লিটারপ্রতি ৮০ টাকার নিচে নামিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে জনগণের করের টাকা থেকে ভর্তুকি দিতে হবে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য জ্বালানি খাত থেকে লাভের চিন্তা বাদ দিতে হবে। 

তিনি বলেন, করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এর প্রভাবও সবকিছুতেই পড়েছে। আগামী ১০ বছরেও এ প্রভাব মেটানো হয়তো সম্ভব না। সার-কীটনাশকের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এসব সংকট মোকাবিলা করতে আমাদের মেধাশক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্রের এত ব্রিজ-কালভার্ট এখন প্রয়োজন নেই। এগুলো আরো ১০ বছর পর করা যাবে। আগে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের কথা ভাবা জরুরি।

আল-আমিন বলেন, তেলের দাম না কমা পর্যন্ত আমি অনশন ভাঙব না। এতে আমার মৃত্যু হলে দায় সরকারকেই নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নিম্নমুখী হলেও সরকার দেশের বাজারে দাম কমাচ্ছে না। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সেই সঙ্গে পারিবারিক জীবনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাবার কেনা দূরে থাক, শিক্ষার স্বাভাবিক খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে, রাষ্ট্রের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করে লিটারপ্রতি ৮০ টাকার নিচে নামিয়ে আনা।

ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে যুক্ত আল–আমিন আটিয়ার আন্দোলনের বিষয়ে কথা হয় গণ অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের সঙ্গে।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি প্রথমে তাকে এই আন্দোলনে নামতে নিরুৎসাহিত করেছিলাম। কারণ এই সরকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝে না। তাই তার অনশনের মর্ম এই সরকার বুঝবে না। তবে তিনি তার নাগরিক দায়িত্ব থেকে আন্দোলন শুরু করেন। আমরা এই ব্যক্তিগত আন্দোলনকে নৈতিকভাবে সমর্থন করেছি। সামনে জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়ে আমরাও সাংগঠনিকভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করব।

বর্তমানে আল-আমিন আটিয়া অধ্যাপক ডা. শওকত আলী আরমানের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের এই চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আল-আমিন অনশনে থাকার ফলে প্রতিনিয়ত শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। যখন প্রেসক্লাবে ছিলেন তখন আমরা গত রবিবার রাতে তাকে দেখে অনেক বুঝিয়ে স্যালাইন দিয়েছিলাম। এরপর তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে অনেক বুঝিয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। এই পর্যন্ত আমরা তাকে চারটি স্যালাইন দিয়েছি। তা ছাড়া সন্ধ্যার পর তাকে অনেক বুঝিয়ে নাক দিয়ে খাবার দেওয়া হয়েছে। আমরা যত কিছুই করি না কোনো, একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে খাবার না খেলে তিনি অসুস্থ হবেই। দিনের পর দিন স্যালাইন দিয়ে তো একজন মানুষকে সুস্থ রাখা সম্ভব নয়।

এই চিকিৎসক আরো বলেন, আল-আমিনের শারীরিক অবনতির সঙ্গে মানসিক চাপও রয়েছে। তার পরিবার থেকে অনশন থেকে ফিরে আসতে বললেও তিনি তা করছেন না। এমন চলতে থাকলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত