প্রাক্তন হলিক্রস টপারের ফেসবুক স্ট্যাটাস

'হলিক্রস কর্তৃপক্ষের ভুল স্বীকার করা উচিত'

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ১১:২৩ পিএম

হলিক্রস স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পারপিতা ফাইহা (১৪) নিজের বাসার ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মারা গেছে গত মঙ্গলবারে। সে ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল ছিল। কিন্তু পরপর দুইবার হায়ার ম্যাথে ফেল করেছিল। এ জন্য পারপিতার মা-বাবাকে স্কুলে নিয়ে যেতে বলা হয়। অভিভাবকদের ডেকে নিয়ে তাকে অপমান করা হবে- এমন ভয় থেকে পারপিতা আত্মহত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠছে। কেউ কেউ বলছে স্কুলের অংক টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়তে রাজি না হওয়ায় ওই স্যার তাকে ইচ্ছে করে প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িকে ফেল করিয়ে দেন।

সব মিলে হলিক্রসের পড়ালেখা আর সংস্কৃতি নিয়ে জোর সমালোচনা চলছে যা হলিক্রস কাল্টের ছাত্রীরা ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। হলিক্রসের একজন প্রাক্তন ফার্স্ট গার্ল হিসেবে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু পর্যবেক্ষণ জানাতে চাই।

হলিক্রস রেজাল্টমুখী না। হলিক্রসের একজন ছাত্রী শুধু পড়ালেখা করে কখনোই পার পাবে না। তাকে খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সর্বোপরি আচরণে শ্রদ্ধাশীল, অনুকরণযোগ্য হতে হবে। হলিক্রসে একজন ফার্স্ট গার্ল এবং ফেল করা ছাত্রীর মধ্যে মর্যাদার কোনো পার্থক্য নেই।

হলিক্রসের টিচাররা প্রাইভেট পড়াতে পারেন না। এটা সম্পূর্ণ নিষেধ। ক্লাসেই ভালো করে পড়াতে হবে। কোনোভাবে ছাত্রীকে আলাদাভাবে টিচারের কাছে পড়তে যাওয়ার ইন্ধন জোগানো যাবে না।
হলিক্রসে ছাত্রীদের গায়ে হাত তোলা নিষেধ। নিয়ম ভাঙলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা আছে- কানে হাত ধরে দাঁড়ানো, ক্লাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইত্যাদি। কিন্তু মারা যাবে না।
এগুলো স্কুলের নিয়ম। এই নিয়ম কি সব সময় মানা হয়? না।

আমি নিজে একজন সিস্টারের হাতে চড় খেয়েছি ক্লাস ফোরে, কারণ উনার কথার মধ্যে কথা বলেছিলাম। আরেক মিসকে দেখেছি ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাকে মারতে। উনাদের নামে কেউ অভিযোগ করে নাই। আমিও না। টিচারের নামে যে অভিযোগ করা যায় এটাই আমরা জানতাম না।

ক্লাস ফাইভে আমার ওপর পড়ার চাপ এত বেড়ে গেছিল যে আমি পড়া ছাড়া আর কোনোদিকে তাকাতে পারতাম না। এই চাপ কে দিত? স্কুল? না। ক্লাসটিচার দিতেন। কারণ আমি রেকর্ড নম্বর পেলে উনার সুনাম হবে। সেই চাপ বাড়িতে চলে আসত। ঘর-বাইর কোনোখানে দম নেওয়ার সুযোগ পেতাম না।

হলিক্রসে বুলেটিন বোর্ড বলে সুন্দর একটা ব্যাপার আছে। মেয়েরা একটা বিষয়ে গবেষণা করে সেটা নিয়ে লেখে, ছবি আঁকে। সেগুলো দিয়ে বোর্ড সাজায়। কোন ক্লাসের বুলেটিন বোর্ড কত সুন্দর তা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। ক্লাস ফাইভে আমি একবার বললাম বুলেটিন বোর্ডের দায়িত্ব থেকে আমাকে অব্যাহতি দিতে। কারণ পড়ার চাপ নিতে পারছিলাম না। ক্লাসটিচার স্কুলশেষে বললেন, 'তোমার গার্ডিয়ানকে আমার সাথে দেখা করতে বইলো।'

'তোমার গার্ডিয়ানকে আমার সাথে দেখা করতে বইলো'- এইটা একটা ব্রহ্মাস্ত্র। এর মানে উনি আমার গার্ডিয়ানকে লজ্জা দেবেন, এরপর গার্ডিয়ান আমাকে লজ্জা দেবে। সেই ভয়ে আমি টুঁ শব্দটি না করে বুলেটিন বোর্ডে হাত দিলাম।

ক্লাস সিক্সে সেলাই মিস আমার মাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন আমি যেন ক্লাসের ফেল করা মেয়েদের সাথে না মিশি, এতে নাকি আমার পড়ালেখায় খারাপ প্রভাব পড়বে। এটা কি উনাকে হলিক্রস বলতে বলেছে? না, উনি উপযাচক হয়ে বলেছেন।

ক্লাস এইটে ইংলিশ টিচার আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত করে নিয়েছিলেন। কারণ আমি উনার ক্লাস করতাম না। উনার ক্লাসে বসে খাতায় ছবি আঁকতাম। এতে উনি অপমানিত বোধ করতেন। আমি উনার ক্লাস করতাম না, কারণ উনি খারাপ পড়াতেন। উনি আসলে পড়াতেনই না। ক্লাসে এসে উনার ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবনের গল্প করতেন। আমরা বন্ধুরা এটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতাম। উনি আমাকে দাঁড় করিয়ে পড়া ধরতেন। আমি পড়া পারতাম। উনি আরো রেগে যেতেন। তারপর সেই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতেন- 'তোমার গার্ডিয়ানকে আমার সাথে দেখা করতে বইলো।'
উনি গার্ডিয়ান ডেকেই থামেন নাই। উনি টিচার্স রুমে আমার নামে বদনাম ছড়িয়েছেন। আমি কত খারাপ তা কাউকে জানাতে বাকি রাখেন নাই। এতবার আমার গার্ডিয়ান ডাকা হয়েছে যে আমি অপমানে হেঁট হয়ে গেছিলাম।

ক্লাস নাইন-টেনে আমি লাগাতার অংকে ১০০-তে ৯৯ পেয়েছি। কোনো কারণ ছাড়া। কারণ ওই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ি নাই। ১০০-তে ৯৯ খারাপ নম্বর না। কিন্তু এই এক নম্বর কম পাওয়ায় আমার জীবনে যে ঝড় নেমে আসত তা কহতব্য নয়। আমি এই স্যারের নামেও অভিযোগ করি নাই। কারণ আমার মনে হয় নাই কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবে।

এই অসহনীয় দিনগুলো কেন পার করেছি আমি? কারণ আমার কথা শোনার কেউ ছিল না। শিক্ষক যে খারাপ মানুষ হতে পারেন, শিক্ষক যে ভুল করতে পারেন এটা আমাকে কেউ বলে নাই। কেউ বলে নাই কোথায় গিয়ে অভিযোগ করতে হবে। এমনকি আমার গার্ডিয়ানও কখনো বলে নাই যে আমার টিচাররা অন্যায় করছেন। আমার জীবনের সবচেয়ে আতংকপূর্ণ এবং নিঃসঙ্গ সময় ছিল হলিক্রস স্কুলের শেষ কটা বছর। এত চাপ, এত অপমানের পর আমি কেন আত্মহত্যা করি নাই, কে জানে?

হলিক্রস আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অভিজ্ঞতাগুলোর একটা। আমার জীবনের প্রথম স্বপ্ন পূরণ হলিক্রস। আমার দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, সততা, মানবতার ভিত্তি হলিক্রস গড়ে দিয়েছে। কিন্তু হলিক্রস শিক্ষকদেরকে যে প্রশ্নাতীত মর্যাদা দেয় এবং ছাত্রীদেরকে অনুশাসনে রাখতে গিল্ট আর শেইমের যে মেকানিজমের চর্চা করে, তা ভীষণ ক্ষতিকর। যা প্রয়োজন তা হলো বাচ্চাগুলোকে অভয় দেওয়া, মন খুলে কথা বলতে দেওয়া, আর শিক্ষকদেরকে তাদের ব্যক্তিচরিত্রের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। 

ভুল শুধরানোর প্রথম ধাপ হলো ভুল স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া। আমাকে হলিক্রস শিখিয়েছে এটা। এবার এটা হলিক্রসের কর্তৃপক্ষকে করতে হবে। ভিত্তিহীন গুজব বলে অন্যায় আড়াল করার উপায় নাই।

(তৃষিয়া নাশতারান এর ফেসবুক পোস্ট)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত