সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে ইরাশাদ করেন, ‘আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তার রাসুলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাদের সঙ্গী হবে। তারা হলেননবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।’ সুরা আন নিসা : ৬৯
তিনি আরও বলেন, ‘আর যে কেউ আল্লাহ ও তার রাসুলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।’ সুরা জিন : ২৩
আল্লাহতায়ালা এই জগৎকে সৃষ্টি করে সবার প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় রিজিক, ভোগসামগ্রী, আসবাবপত্র, সাজ-সরঞ্জাম, ধন-সম্পদ ও পশু-প্রাণী ইত্যাদি সবই সরবরাহ করেছেন। সৃষ্টির কল্যাণ ও উপকারার্থে এবং অনতিক্রম্য সুনির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জীবন অতিবাহিত করার জন্য এই ধরণিকে তিনি উপযোগী ও অনুকূল করে দিয়েছেন। এ মর্মে তিনি বলেন, ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, অতএব তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তার দেওয়া রিজিক থেকে তোমরা আহার কর। আর পুনরুত্থান তো তারই কাছে।’ সুরা মুলক : ১৫
যখন আল্লাহতায়ালা এই জগৎকে পরিপূর্ণ ও সৌন্দর্যম-িত করে সৃষ্টি করে তাতে বিদ্যমান সবার জীবনোপকরণের পর্যাপ্ত বিষয় সরবরাহ করলেন এবং প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন উপকারী বস্তু, বাঁচার জন্য ও অগ্রগতি সাধনের জন্য বিভিন্ন উপকরণকে অনুকূল করে দিলেন; সেই সঙ্গে আমাদের রব আমাদের জানিয়ে দিলেন যে, তিনি এ জগৎকে অযথা সৃষ্টি করেননি এবং এমনিতেই ছেড়ে দেবেন না ও তাকে এড়িয়ে যাবে না! তিনি বলেন, ‘আর আসমান, জমিন ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তা আমি খেলার ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি যদি খেলার উপকরণ গ্রহণ করতে চাইতাম তবে আমি আমার কাছ থেকেই তা গ্রহণ করতাম; কিন্তু আমি তা করিনি। বরং আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার ওপর, ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর তোমরা আল্লাহকে যে গুণে গুণান্বিত করছ তার জন্য রয়েছে তোমাদের দুর্ভোগ।’ সুরা আল আম্বিয়া : ১৬-১৮
আল্লাহতায়ালা তার সৃষ্টিকে অন্যের কাছে সঁপে দেননি, বরং তিনি এই দৃশ্যমান জগৎকে এক চরম সত্যের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তা হলো তারই একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা, সব ইবাদত-বন্দেগি তার জন্য সম্পাদন করা, কল্যাণ সাধন ও পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রব এর ইবাদত কর, যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও। যিনি জমিনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।’ সুরা আল বাকারা : ২১-২২
সৎ ও আনুগত্যমূলক কাজের মাধ্যমে পৃথিবীকে উপযোগী করতে এবং তাকে শিরক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা- হতে পবিত্র ও মুক্ত করতে আল্লাহতায়ালা বহু নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন, তাদের সর্বশেষ ও সর্দার হচ্ছেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসুল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।’ সুরা আন নাহল : ৩৬
আল্লাহতায়ালা সকল নবী-রাসুলকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা জীবনে তা-ই উপভোগ করে আল্লাহতায়ালা উত্তম যা কিছু তাদের জন্য হালাল করেছেন এবং তারা যেন আনুগত্যমূলক ভালো কাজে অবিচল থাকেন, যা ছাড়া পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। আর নবী-রাসুলদের অনুসারী মুমিনদেরও তাদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে নবী-রাসুলগণ ও তাদের অনুসারী মুমিনগণ এই পৃথিবীকে সৎ আমল ও কল্যাণ সাধনের স্থান-কাল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারাই কল্যাণ ও জান্নাত লাভ করে ধন্য হয়েছেন। সৎ আমলের সুফল মূলত ব্যক্তির নিজের ও অন্যদের মাঝে প্রতিফলিত হয়, বিশেষ করে ইসলামের পাঁচটি রুকনের ওপর আমলের দ্বারা। আর বাকি ইবাদতগুলো এই পাঁচটি রুকনের অধীন।
অতএব হে মুসলিম ভাই! কোনো ভালো আমলকেই ছোট করে দেখবেন না। কেননা আপনি তো জানেন না কোন আমলের বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবেন ও জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবেন। হাদিসে এসেছে, হজরত জাবের (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। আর নিশ্চয় তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একটি ভালো কাজ।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় রাস্তায় একটি কাঁটাযুক্ত ডাল দেখতে পেয়ে তা সরিয়ে ফেলল। আল্লাহতায়ালা তার এ কাজ সাদরে কবুল করে তার গোনাহ মাফ করে দিলেন।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। আর কোনো পুণ্য কাজ হলে আল্লাহ সেটাকে বহুগুণ বর্ধিত করেন এবং আল্লাহ তার নিকট থেকে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।’ সুরা আন নিসা: ৪০
এভাবেই মুমিনরা এই জগৎকে সৎকর্মের স্থান ও উপযুক্ত সময় হিসেবে গ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না বরং কুফরি করে, সে এই পার্থিব জগৎকে প্রবৃত্তিচারণ, হারাম কাজ, ভোগ বিলাসিতা ও পাপাচার্যের স্থান ও কাল হিসেবে গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে বড় পাপকাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে (শিরক) অংশীদার স্থাপন করা। সেটা এভাবে যে, বান্দা আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির কারও কাছে প্রার্থনা করে, আশা ও ভরসা করে, তার কাছে সাহায্য ও উদ্ধার কামনা করে, তার কাছে চাওয়া-পাওয়া ব্যক্ত করে, তার কাছে রিজিক ও সাহায্য তালাশ করে, বিপদাপদ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য তার কাছে ধরনা ধরে ইত্যাদি সবই শিরক, যা তওবা ছাড়া আল্লাহ ক্ষমা করেন না। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তার সঙ্গে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না, আর তার থেকে ছোট যাবতীয় গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন। আর যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।’ সুরা আন নিসা : ১১৬
শিরকের পর ভয়াবহতম অপরাধ ও পাপ হলো কবিরা গোনাহসমূহ। বান্দা কোনো পাপ করে যখন সে নিজের ওপর জুলুম করে, যা তার ও আল্লাহর মাঝে সীমাবদ্ধ; অতঃপর তওবা করে তখন আল্লাহতায়ালা তার গোনাহকে ক্ষমা করে দেন। আর যদি বান্দাদের সঙ্গে জুলুম করে থাকে, তবে মজলুমকে তার হক ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। এমনকি সেদিন হলেও যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম (টাকা-পয়সা) থাকবে না; জালেম ব্যক্তির কোনো নেকি থাকলে সেদিন মজলুমকে দিয়ে দেওয়া হবে, এভাবে যদি তার নেকি শেষ হয়ে যায় তখন মজলুম ব্যক্তির গোনাহগুলো তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোনো (মুসলিম) ভাইয়ের ওপর তার সম্মানহানি বা অন্যকোনো বিষয়ে জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে হালাল করে নেয় সে দিন আসার পূর্বে যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না। তার যদি কোনো নেক আমল থাকে, তবে তার জুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী তা হতে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার নেকি না থাকে, তবে তার সঙ্গীর (মজলুমের) পাপরাশি নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ সহিহ মুসলিম ও সুনানে তিরমিজি
অতএব গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন, যদিও তা আপনার চোখে ছোট অপরাধ হয়। কেননা সেটার জন্যও আল্লাহর কাছে জাবাবদিহি করতে হবে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ছোট ছোট গোনাহ হতে সাবধান থাক। কেননা তা ব্যক্তির ওপর জমতে জমতে অবশেষে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে।’ মুসনাদে আহমাদ
২৬ আগস্ট মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।
অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
