দীর্ঘদিন আন্দোলনের পরে কাজে ফেরা চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুনলেন তাদের সুখ-দুঃখ, ভালো লাগা-মন্দ লাগার কথা। শ্রমিকদের সঙ্গে ভিজল তার চোখের পাতাও। চা শ্রমিকদের প্রতি নিজের আলাদা দায়িত্ব আছে উল্লেখ করে দিলেন তাদের জীবনমান উন্নয়নের আশ্বাস। বললেন, আওয়ামী লীগ সরকার চা শ্রমিকদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।
গতকাল শনিবার বিকেল ৪টার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন শেখ হাসিনা। ভিডিও কনফারেন্সে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকে যোগদানকারী চা শ্রমিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ দায়িত্ব সরকার নেওয়ার পর থেকেই চা শিল্পকে বিকশিত করার পাশাপাশি চা শ্রমিকরা যাতে উন্নত জীবনযাপন করতে পারে সে বিষয়ে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চা শ্রমিকদের সব সমস্যা সমাধান এবং চা শিল্পকে (দেশের অন্যান্য অঞ্চলে) ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট রয়েছি। পঞ্চগড়ে নতুন করে চা চাষ শুরু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু) যখন তৎকালীন চা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তখন এই শিল্পের বিকাশ ও চা শ্রমিকদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যখন মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন তখন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাকে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান করেন। জাতির পিতাই চা বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে ১৯৫৮ সালে তিনি গ্রেপ্তার হলে ২৩ অক্টোবর স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সে দায়িত্ব কেড়ে নেন। কিন্তু তিনি সেই সময়েই চা-বাগান এবং শ্রমিকদের অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে চা শিল্প যেন নবউদ্যমে যাত্রা শুরু করতে পারে সে পদক্ষেপও তিনি নেন।
জাতির পিতা মতিঝিলে চা বোর্ডের প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন এবং টি অ্যাক্টের ৭ নম্বর ধারার সংশোধনীতে টি লাইসেন্সিং কমিটি বিলুপ্ত করে কমিটির কার্যক্রমকে টি বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে চা গবেষণাগারও নির্মাণ করেন এবং বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধারও ব্যবস্থা করেন এবং ’৭০-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে চা শ্রমিকদের বিশাল সমাবেশেও তিনি ভাষণ দেন এবং চা শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলেন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
চা শ্রমিকদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চা বাগানের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে চা শ্রমিকরা যাতে সঠিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে সেজন্য তার সরকার তাদের দৈনিক মজুরি এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করেছে।
এদিকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের নারী চা শ্রমিক গীতা পাইনকা ও সোনামনি রাজবংশীর দুঃখের কথা শুনে আবেগে কেঁদে ফেললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে কাঁদেন চা শ্রমিকরাও।
কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক গীতা পাইনকা তার বক্তব্যের প্রথমে চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানান। তিনি মজুরি বৃদ্ধি করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। এসময় অশ্রুসিক্ত নয়নে গীতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আমরা সবসময় আপনার কথা ভেবে এসেছি এবং ভেবে যাব। আমরা জানি, আপনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি। আমরা চাই আপনার বাবার মতো আপনিও কোনোদিন আমাদের কাছ থেকে সরে যাবেন না। আপনি আমাদের কাছে চিরজীবী থাকবেন। আমরা চা শ্রমিকরা যে কষ্টে আছি সেটা আপনি দেখেছেন এজন্য আপনাকে কোটি কোটি ধন্যবাদ। আপনাকে আমাদের কমলগঞ্জ উপজেলায় এক কাপ চায়ের দাওয়াত দিচ্ছি। আপনি আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আপনাকে আমরা দেখছি, এটা যে আমাদের জন্য কত আনন্দের সেটা মুখের ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
এসময় প্রধানমন্ত্রী আবেগে অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘আপনারা যেটা করেছেন সেটা বাঁচার তাগিদে করেছেন। আমি সেটা বুঝি। এজন্য আগে আমি মালিকদের সঙ্গে বসেছি, এখন আপনাদের সঙ্গে বসলাম।’
অপরদিকে মাধবপুর চা বাগানের নারী শ্রমিক সোনামনি রাজবংশী বলেন, ‘আমি আপনার ওপর খুশি আছি। আগে ১২০ টাকা পেতাম এখন ১৭০ টাকা পাই মা। আপনি আমাদের একটা সুবিধা করিয়া দিবেন যাতে পেট ভরিয়া খেতে পারি। এসময় বাগানের স্কুলগুলো সরকারি করার দাবি জানান সোনামনি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোনামনির উত্তরে বলেন, ‘আমার বাবা আপনাদের নাগরিকত্ব দিয়েছেন। আমি সবাইকে ঘর করে দেব। ছেলেমেয়ে নিয়ে যাতে ভালোভাবে থাকতে পারেন সেটা করে দেব।’ পরে প্রধানমন্ত্রী চা বাগানের ঐতিহাসিক ঝুমুর নাচ দেখেন এবং তার প্রশংসাও করেন।
এর আগে গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী চা বাগান মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন যেখানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং তাদের জন্য অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আনুপাতিক হারে বাড়ানো হবে বলেও জানানো হয়।
