মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কমিয়ে আনতে ডলারের অভিন্ন দর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা)। বাজার যাচাই করে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে অভিন্ন দরে ডলার কেনাবেচা করতে আরও সময় চেয়েছে সংগঠন দুটি।
এ দুই সংগঠনের নেতারা বলছেন, ডলারের বাজার পর্যবেক্ষণ এবং আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি বুঝতে তাদের আরও সময় প্রয়োজন। ডলারের অভিন্ন দর নির্ধারণে গত ১৪ আগস্ট হওয়া বৈঠকের অগ্রগতি জানতে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের সভাপতিত্বে বৈঠক শুরু হয়। গতকালের বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আগামী রবিবার পুনরায় বৈঠকে বসবে দুই সংগঠন।
বৈশি^ক পরিস্থিতির কারণে আমদানি-রপ্তানিতে রেকর্ড ঘাটতির কারণে বিদেশি মুদ্রা বিশেষ করে মার্কিন ডলার নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। আর এই সংকটকে পুঁজি করে ডলার লেনদেন থেকে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স আনা ও আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি, কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত বিনিময় মূল্য মানছে না কোনো ব্যাংকই। অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচায় অস্থিরতা বিরাজ করছে। ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এমন অবস্থায় ডলারের বাজারে করণীয় নির্ধারণে বৃহস্পতিবার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকের শেষ দিকে যোগ দেন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
বৈঠক শেষে বাফেদার চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম বলেন, বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ডলারের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গভর্নর জানিয়েছেন, লেনদেন ভারসাম্য অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানির ব্যবধানে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে আসতে শুরু করেছে।
ডলারের দর নির্ধারণের বিষয়ে এবিবি ও বাফেদা রবিবার বৈঠক করবে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে। ডলারের বাজার দর যেখানে যায়, সেটি দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গভর্নরও তাই বলেছেন। ডলারের বাজার দর দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এবিবি চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেন ঘাটতি কমে আসায় আগামী দুই মাসের মধ্যে ডলারের দাম স্থিতিশীল হয়ে আসবে। আমরা বাজার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। বাজার যাচাই করে ডলারের একক দাম নিধার্রণ করতে রবিবার আবারও বৈঠকে বসবে এবিবি ও বাফেদা।
এর আগে ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আন্তঃব্যাংক লেনদেন বাজার সচল করতে ডলারের অভিন্ন দর প্রস্তাব করবে বাফেদা। তিন সপ্তাহ পার হলেও সেই প্রস্তাব জমা দেয়নি সংগঠনটি। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয়, ব্যাংকগুলো যে দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ডলার সংগ্রহ করবে তার গড় দরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১ টাকা বেশি দরে বিক্রি করতে পারবে। আর সেই দরের সঙ্গে সর্বোচ্চ দেড় টাকা যোগ করে খোলাবাজারে ডলার বিক্রি করবে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত বছরের জুনেও দেশের বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ৮৫ টাকার ঘরে ছিল। এরপর থেকে আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে ডলারের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর চলতি বছরের মার্চ থেকে ডলারের চাহিদা আকাশচুম্বী হতে থকে। অস্থিরতা কমাতে ব্যাংকগুলোতে ডলার সরবরাহের পাশাপাশি কিছু নীতি সিদ্ধান্তসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর নির্ধারণের বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। নিয়মিত টাকার মান কমানোর পাশাপাশি চাহিদা মেটাতে বড় অঙ্কের ডলারও বিক্রি করে আসছিল।
কিন্তু চাহিদা ও অস্থিরতা না কমায় গত ২৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈঠক করে বাফেদা ও এবিবির সঙ্গে। ওই বৈঠকে নির্দিষ্ট একটি ‘সিলিংয়ের’ মধ্যে আন্তঃব্যাংকে লেনদেনে ডলারের একক দর নির্ধারণের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়েছিল বাফেদা। ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ডলারের বিনিময় হার কেমন হবে সেটির প্রস্তাব দেবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক সেই দর বাস্তবায়নে তদারকি করবে। ওই বৈঠকের পর মে মাসের শেষ সপ্তাহে বাফেদা একটি প্রস্তাবও জমা দেয়। সে অনুযায়ী কিছু সিদ্ধান্ত এলেও পরের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।
