মিতু হত্যার তদন্ত নতুন মোড় নিতে পারে

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৩৮ এএম

চট্টগ্রামে মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে যখন অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তখন নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলার আবেদন করেছেন বাবুল। তার অভিযোগ তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

অপরদিকে গত মাসের শুরুতে সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে পুুলিশপ্রধানের কাছে আবেদন করেছে বাবুল আক্তারের পরিবার। অন্যদিকে আরেক আসামি এহতেশামুল হক ভোলা তার জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছে আদালতে। সব মিলিয়ে মিতু হত্যাকা-ের তদন্ত নতুন মোড় নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিপক্ষ সবসময় সুবিধা পাওয়ার জন্য নানা ধরনের অপপ্রচার চালায়। মিতু হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও তেমনই চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে তদন্ত কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।’

পিবিআই হেফাজতে থাকার সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দাবি করে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ ড. বেগম জেবুন্নেছার আদালতে বাবুল আক্তার মামলার আবেদন করেন। আবেদন শুনানি দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৯ সেপ্টম্বর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিবিআইর করা মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের আগে পিবিআইপ্রধানসহ ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাবুল আকতার মামলার আবেদন করায় নতুন করে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সন্দেহের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। যাদের বিরুদ্ধে বাবুল আক্তার অভিযোগ এনেছেন তাদের মধ্যে নাজমুল হাসান তার ব্যাচমেট; মহিউদ্দিন সেলিম তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। 

মিতু হত্যাকা-ে স্বামী বাবুল আকতারসহ সাত আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে পিবিআইর অভিযোগপত্রে। সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে ৯১ জনের। বাবুল আক্তার তার শ্বশুরের দায়ের করা মামলায় ১৫ মাস ধরে ফেনী কারাগারে আটক রয়েছেন।

জানা গেছে, মিতু হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় গত বছরের ১২ মে নতুন করে দায়ের করা মামলায় বাবুলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবুল আক্তারকে নেওয়া হয় পাঁচ দিনের রিমান্ডে। ১৭ মে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল আক্তারকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার জাহানের খাসকামরায় হাজির করার পর তিনি জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানান।

তদন্ত সংস্থা পিবিআইর প্রধান বনজ কুমার এই হত্যাকান্ডের মাস্টার মাইন্ড হিসেবে মিতুর স্বামী বাবুল আকতারের নাম জানিয়েছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাবুলের পরকীয়ার তথ্য, হত্যাকান্ডে জড়িতদের সঙ্গে বিকাশে টাকা লেনদেনের তথ্য জানানো হয়। বাবুল আক্তার ৩ লাখ টাকা দিয়ে মিতুকে খুন করিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আদালতে দাখিলের অপেক্ষায় আছে।

বাবুল আক্তারের পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া এবং এ নিয়ে মিতুর সঙ্গে তার বিরোধকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তখন ভারতীয় নারী গায়েত্রীর সঙ্গে বাবুল আক্তারের পরকীয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। গায়েত্রীর উপহার দেওয়া বইয়ে বাবুল আকতারের লেখার সূত্র ধরে পরকীয়ার সন্দেহ করা হয়। তবে এটাকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। বাবুলের কথিত প্রেমিকা গায়েত্রী অমর সিংয়ের কোনো হদিস না মেলার কারণে পুরো হত্যাকা-ের ঘটনা রহস্যজনক বলেও মনে করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, উপহার দেওয়া বইয়ের পাতায় বাবুল আকতারের হাতের লেখা শনাক্ত করা হলেও গায়েত্রী অমর সিংয়ের লেখাকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না।

গত ২ আগস্ট পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদের কাছে আবেদন করে বাবুল আক্তারের পরিবার। সেখানে বলা হয়েছে, পিবিআইপ্রধানের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হচ্ছেন বাবুল আক্তার। এ কারণে তারা অন্য কোনো সংস্থা দিয়ে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন করে দোষীদের শাস্তি চেয়েছে পরিবারটি।

এদিকে আসামি এহতেশামুল হক ভোলা জবানবন্দি দেওয়ার আগে একটি বিশেষ ডায়েরির মাধ্যমে বিষয়টি আদালতকে অবহিত করেছিলেন। পরবর্তীকালে ভোলা ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারেরও আবেদন জানিয়েছেন। তার দাবি, পিবিআইর কর্মকর্তারা তাকে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন তিনি আদালতে সেটাই বলেছেন। নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।

যদিও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী জবানবন্দি প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সুতরাং, ভয় দেখানোর অভিযোগ সঠিক নয়। আসামি এহতেশামুল হক ভোলা ২০১৮ সালের ৬ মে থেকে হাইকোর্ট থেকে স্থায়ী জামিনে রয়েছেন।

২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে নিজের সন্তানকে স্কুলে নেওয়ার পথে খুন হন বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতু। প্রথমে এই হত্যাকা-ে জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত স্বামী বাবুল আকতারের দিকেই সন্দেহের আঙুল ওঠে।

অবশ্য স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দেওয়ার কারণে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আকতার তার সোর্সদের দিয়ে নিজের স্ত্রীকে কেন হত্যা করিয়েছেনসেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর নেই তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে।

তদন্তের ফাঁকফোকর নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে তার জট খুলতে অপেক্ষা করতে হবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া পর্যন্ত। কবে নাগাদ অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে সেই সম্পর্ক সুনির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য দিতে পারছেন না পিবিআইর কর্মকর্তারা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ ওঠায় আমাদের মধ্যেও এখন আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা গোপনে আরও তদন্ত করছি। দেখা যাক সামনে বিষয়টি কোন দিকে যায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত