উন্নত বিশ্বে বীমা বাধ্যতামূলক হলেও বাংলাদেশে এটি এখনো হয়ে ওঠেনি। ফলে যেকোনো কঠিন রোগ কিংবা দুর্ঘটনা, দুর্যোগকালে ব্যক্তিকে হঠাৎ করেই বড় অঙ্কের আর্থিক চাপে পড়তে হয়। এ ক্ষেত্রে ধনীরা সমস্যায় না পড়লেও বিপাকে পড়ে যায় সাধারণ মানুষ। কিন্তু যদি বীমা করা থাকে, তাহলে সুরক্ষা পেতে পারে। তবে প্রচারণা, সচেতনতার অভাবে দেশের অধিকাংশ মানুষ বীমা সুবিধার বাইরে থেকে গেছে। যদিও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে বীমা।
দেশের বেসরকারি খাতের বীমাশিল্পের বিকাশ হয়েছে ৩৭ বছর আগে। বেড়েছে বীমা কোম্পানির সংখ্যাও। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও অধিকাংশ মানুষ, শিল্প-কারখানাসহ বাণিজ্যিক ভবন বীমার আওতায় না থাকার কারণে দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ক্রমেই কমছে। বাংলাদেশের বীমা খাত অন্যান্য দেশের তুলনায় জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছে না। উন্নত দেশে বীমা খাতের গড় অবদান যেখানে ৭ শতাংশ, সেখানে আমাদের দেশে বীমা খাতের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের নিচে। বীমা প্রিমিয়ামে মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৯ ডলার, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন।
তবে বীমাশিল্পে দেশের এই সর্বনিম্ন অবস্থানই খাতটির প্রসার বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন বীমা ছাড়াও শস্য, বাণিজ্যিক ভবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীমার আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্পটি ভবিষ্যতে আরও বড় হতে যাচ্ছে। দেশের শতভাগ জীবন ও সম্পদ বীমার আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় বীমা নীতি ২০১৪ গ্রহণ করেছে। জাতীয় বীমা নীতি বাস্তবায়ন করতে পারলে বীমা খাতের বিদ্যমান বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতার জন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা বিষয় অন্তর্ভুক্তি, দরিদ্র মানুষের জন্য পলিসি তৈরি, সামাজিক বীমার প্রচলন, নতুন পণ্য তৈরি, ক্ষুদ্র বীমা, বীমায় নারীর অন্তর্ভুক্তি, দায় বীমার প্রসার, সরকারি সম্পত্তির বাধ্যতামূলক বীমা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলো বাস্তবায়িত হলে জিডিপিতে বীমার অবদান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
তবে বীমাশিল্প প্রসারে বীমাদাবি পরিশোধ ও আস্থার সংকট বাধা তৈরি করছে। এই বাধা দূর করতে প্রয়োজন বীমা কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, সময়মতো বীমাদাবি পরিশোধের ব্যবস্থা। এ খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা গেলে খাতটি যেমন বড় হবে, তেমনি মানুষের আর্থিক, সামাজিক নিরাপত্তাও বাড়বে। ইতিমধ্যে খাতটিতে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে আইডিআরএ।
বীমায় আস্থা অর্জন ও সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে কাজ করছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ)। বীমা খাতের বিকাশ নিয়ে আইডিআরএর বর্তমান চেয়ারম্যান জয়নুল বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বীমা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইডিআরএ কাজ করছে। শৃঙ্খলা আনতে হলে আইনগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, বীমাকারীদের সুবিধার্থে বীমা পলিসিসংক্রান্ত সব তথ্য-উপাত্ত একটি ডিজিটাল পলিসি রিপোজিটরিতে সংরক্ষণের জন্য ইউনিফায়েড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম করা হচ্ছে। যেখানে প্রিমিয়াম জমা দিলে আপনি মেসেজ পাবেন। এটা আমাদের করা হয়েছে। আমরা যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি তার মাধ্যমে পলিসিসহ সব তথ্য অটোমেশনের মাধ্যমে কোম্পানি থেকে পাব। এই প্ল্যাটফর্মের কাজ এখনো হচ্ছে। পুরোপুরি শেষ হলে আমরা টোটাল অটোমেশনটা পাব। আমাদের প্রকল্পটি চলছে, এটির মেয়াদ আরও দেড় বছর আছে। এর জন্য ডিজিটাল হার্ডওয়্যার কেনা হচ্ছে।
জাতীয় বীমা নীতি-২০১৪তে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান ৪ শতাংশ করতে হবে। কিন্তু দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশের জীবন বীমা রয়েছে। আবার নন-লাইফ বীমার ক্ষেত্রেও আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি নেই। এ খাতে প্রিমিয়াম বৃদ্ধির হার মাত্র ৫ শতাংশ। পলিসি তামাদি হওয়ার হার বেড়েছে। এটাও বড় একটা সমস্যা। বীমার এ দুই খাতেই ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর যে সুযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমেই শিল্পটির বিকাশে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশে বড় বড় কারখানা ও মেগা প্রজেক্ট, মার্কেট হলেও দায় বীমা লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্সের প্রসার ঘটেনি।
এ বিষয়ে জয়নুল বারী বলেন, বীমার প্রসার বাড়াতে আমরা ঠিক করেছি প্রতি বছর কয়েকটি জনসচেতনতামূলক সভা-সেমিনার করব। রাজধানী ছাড়াও এগুলো বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে করা হবে। বীমার বিষয়ে মানুষের কী ধরনের সচেতনতা থাকতে হবে, বীমা করে মানুষ যাতে ভুল না বোঝে, বীমা গ্রহীতা কীভাবে পরিচালনা করলে লাভবান হবে, কীভাবে তাদের কোনো অসুবিধা হবে না, সে বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমে প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলাদেশের বীমা খাতের সমস্যাগুলোর মধ্যে পলিসি তামাদি হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর প্রায় ৭৮ শতাংশ জীবন বীমা পলিসি তামাদি হয়ে যায়। কেবল এই সমস্যা সমাধান করা গেলে জিডিপিতে বীমার অবদান অনেক বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান সম্পর্কে আইডিআরএ চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর কারণ হলো গত কয়েক বছরে জিডিপির আকার অনেক বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় বীমার প্রসার হয়নি। যদিও বিগত বছরগুলোর তুলনায় আমাদের পলিসি সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু এটি বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় কম। নিয়ম-নীতিগুলো ঠিকমতো পালন করলে জিডিপিতে আমাদের অবদান আরও বাড়বে।
‘বীমা কোম্পানিগুলোরও চেষ্টা করা দরকার, তাদের নতুন নতুন প্রডাক্ট নিয়ে আসতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি কৃষি খাতকে বীমার আওতায় আনার। দুই-একটা কোম্পানি এ নিয়ে কাজ করছে। বীমার বৈচিত্র্যায়ণ আনতে হবে। প্রথাগত পলিসি নিয়ে আমরা বসে থাকব কেন। শস্য বীমা একটি কোম্পানিই শুধু করে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ ধরনের প্রকল্প আরও নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। প্রাণিসম্পদ বীমাও আমরা আনার চেষ্টা করছি। এগুলোর জন্য আমাদের বীমা কোম্পানিগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। এটা তো একটি ব্যবসা। ব্যবসা সরকার বেঁধে দিয়ে করতে পারবে না, এটি করতে হবে কোম্পানিগুলোকে।’
বীমাশিল্প একচুয়ারি সংকটে রয়েছে। এ বিষয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, একচুয়ারি নিয়ে আমাদের স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে। এ বছরই আমরা দুজনকে বিদেশে পাঠিয়েছি তারা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল স্কলারশিপ পাবে। বছরে প্রায় এক কোটি টাকা স্কলারশিপ। এ ছাড়া দেশেও যারা বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে আছে যারা, একচুয়ারি স্কলারশিপ করছে, ওদের কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়, সেভাবে আমরা নীতিমালা তৈরি করছি। আমাদের যে একাডেমি আছে, সেখানে একচুয়ারির ডিপ্লোমা করার উদ্যোগ নিচ্ছি। যত দিন পর্যন্ত ফুল একচুয়ারি না পায়, তত দিন পর্যন্ত এটি চালিয়ে যাব।
আমাদের জনবল অনুমোদিত যে অর্গানোগ্রাম আছে সেটার সহকারী পরিচালক এবং আইসিটির যে গ্যাপগুলো আছে, সেগুলো পূরণ করার জন্য দরখাস্ত আহ্বান করেছিলাম। এটির প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে আছে।
