বশেফমুবিপ্রবিতে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, আহত ২২

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:২৮ এএম

ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দিন দিন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। পদবাণিজ্য-চাঁদাবাজিসহ নানা ঘটনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনটির নেতাকর্মীরা পরস্পরের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে অন্য দলের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ, সম্মেলন না করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটি গঠনের কারণে এসব হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। গত সোমবার খোদ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সতর্ক করেছেন। তবে তৃণমূলে বিভিন্ন জায়গায়ই সংঘাত থামেনি সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। 

দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বলছে, গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ২৯ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। গত সোমবার রাতে জামালপুরের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেফমুবিপ্রবি) দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সংগঠনটির অন্তত ২২ নেতাকর্মী। ওই ঘটনায় ভাঙচুর করা হয়েছে বেশ কয়েকটি কক্ষও। আর গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছে অন্তত ৬ জন। এর আগে গত রবিবার রাতে ফরিদপুরে জেলা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে।

আমাদের জামালপুর সংবাদদাতা জানান, সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটিকে কেন্দ্র করে আহ্বায়ক কাউসার আহাম্মেদ স্বাধীন সমর্থিত গ্রুপের সঙ্গে যুগ্ম আহ্বায়ক ফকির এহসানুল হক ইরফান সমর্থিত গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহ্বায়ক কাউসার আহাম্মেদ স্বাধীন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তাইফুল ইসলাম পলাশ, যুগ্ম আহ্বায়ক ফকির এহসানুল হক ইরফান, মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগ, আহসান হাবিব, ওমর ফারুক, সৌরভ, সদস্য রেজওয়ান ফেরদৌস, শাকিল আহাম্মেদ ভুইয়া (জেকি), শাকিল আহাম্মেদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহসহ উভয় পক্ষের ২২ জন আহত হয়েছেন বলে তারা দাবি করেন। আহতদের মধ্যে ফকির এহসানুল হক ইরফান ও শাকিল আহাম্মেদ ভুইয়া (জেকি) জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কাউসার আহ্বায়ক বলেন, রাতে হলে ছিলাম না। শহরে ছিলাম। মির্জা আজম হলের তৃতীয় তলার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আহাদ হোসেন আকাশকে ওই বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য শাকিল আহাম্মেদ ভুইয়া (জেকি) ও আহসান হাবিব মাদক গ্রহণের জন্য চাপ দেন। সে সময় তারা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ওমর ফারুক ও গোলাম জিলানীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরে তারা শাকিল আহাম্মেদ ভুইয়া ও আহসান হাবিবের কাছে গালাগালির কারণ জানতে চান। এসময় শাকিল ও আহসান হাবিব তাদের ওপর হামলা করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্টসহ প্রশাসনের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য কথা বলতে গেলে তারা আমার ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের ওপর হামলা করেন। এতে আমাদের প্রায় ১৬ জন আহত হয়েছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফকির এহসানুল হক ইরফান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ওমর ফারুক, গোলাম জিলানী ও নিশাদ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য শাকিল আহাম্মেদ ভুইয়াকে হলে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে মারধর করে। পরে তাকে উদ্ধার করতে গেলে তারা আমাকে ও মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগের ওপরও হামলা করে। এ ঘটনায় আমাদের ৬ জন আহত হয়েছে।’

ছাত্রলীগের সদস্য শাকিল আহাম্মেদ ভুইয়া জেকি বলেন, ‘আমাকে ওমর ফারুক, গোলাম জিলানী ও নিশাদ জন্মদিনের কেক কাটবে বলে হলে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তারা রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মারধর শুরু করে। আমার বুকে লাথি দিলে মাটিতে পড়ে যাই। তখন তারা আমাকে বুকে ও পিঠে কিল, ঘুষি ও লাথি দেয়। এ খবর পেয়ে ফকির এহসানুল হক ইরফানসহ কয়েকজন আমাকে উদ্ধার করতে গেলে তাদের ওপরও হামলা করে।’

প্রভোস্ট ড. সাদিকুর রহমান জানান, আহতদের কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া এবং দুজনকে জামালপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, কয়েক শিক্ষার্থীর মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। তবে তারা কোন দলের তা জানি না। এ ঘটনায় ডিনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তসাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, গতকাল চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে কলেজ ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ছয়জন আহত হয়েছে। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুল করিম ও সাধারণ সম্পাদক সুভাষ মল্লিক সবুজের অনুসারীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়।

সংঘর্ষে গণিত চতুর্থ বর্ষের সাফায়েত হোসেন রাজু, এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের হামিম রাফসান, ইসলামের ইতিহাস দ্বিতীয় বর্ষের জাহেদুল অভি, স্নাতক (পাস) তৃতীয় বর্ষের ওয়াহিদুর রহমান সুজন, ইতিহাস প্রথম বর্ষের আলিফ জাবেদ, ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র নাঈম আসিফ ও চতুর্থ বর্ষের মোহাম্মদ মনির, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র জিয়াউদ্দিন আরমান আহত হয়েছেন। আহতরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলেজে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাহমুদুল করিম ও সুভাষ মল্লিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে দু’গ্রুপের গত কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর জের ধরে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মূল ভবনের সামনে সুভাষ মল্লিকের অনুসারী ছাত্রলীগের কর্মী জিয়াউদ্দিন আরমানকে মারধর করা হয়। এরপর ছাত্রলীগের দু’পক্ষে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। চকবাজার থানার ওসি মনজুর কাদের বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পেয়ে ফোর্স নিয়ে কলেজে যাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে সেখান থেকে তাদের বের করে দিই। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

এদিকে গত রবিবার রাতে ফরিদপুর শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ক্যাম্পাসে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে কুপিয়ে জখম করেছে সংগঠনটির আরেক গ্রুপের নেতাকর্মীরা। আহত সৌরভ মালো ফরিদপুর শহরের লক্ষ্মীপুর মহল্লার বাসিন্দা উত্তম মালোর ছেলে। স্থানীয়রা আহত সৌরভ মালোকে উদ্ধার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। তিনি বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন।

জেলা ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ছাত্রলীগ জেলা সভাপতি তামজিদুল রশিদ চৌধুরী রিয়ান এবং সাধারণ সম্পাদক ফাহিম আহমেদের নেতৃত্বে বিভক্ত। গত ৪ জুলাই এক ছাত্রলীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ বিরোধ স্পষ্ট হয় গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদ (রুকসু) ভবনে সভাপতি সমর্থিত অংশের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক সমর্থিত অংশের মারামারির ঘটনায়। সে সময় শহর ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সজিব আহমেদ ও তার দুই অনুসারী ফয়সাল, বাপ্পি আহত হয়ে জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। ওই ঘটনায় আহত এবিএম ফয়সাল গত ১২ সেপ্টেম্বর শহর ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমানসহ ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। ওই মামলার চার নম্বর আসামি ছিলেন সৌরভ মালো। ওই সংঘর্ষের জেরে গত রবিবার রাতে সৌরভ মালোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত