অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলায় বিতর্কিত ঠিকাদার ও কথিত যুবলীগ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। গ্রেপ্তার হওয়ার তিন বছর পর এই প্রথম তার বিরুদ্ধে করা কোনো মামলার রায় হলো। এ মামলায় তার সাত দেহরক্ষীকেও যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ ছামিদুল ইসলাম এ রায় দেন। দন্ডপ্রাপ্ত অপর আসামিরা হলেন জি কে শামীমের দেহরক্ষী দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, সহিদুল ইসলাম, কামাল হোসেন, সামসাদ হোসেন ও আমিনুল ইসলাম।
রায়ে দন্ডিত প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড দিয়েছে আদালত। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাদের আরও তিন মাস কারাভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
রায় ঘোষণার সময় আসামিদের সবাই আদালতে ছিলেন। রায়ের পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
জি কে শামীমের বিরুদ্ধে মাদক, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো অভিযোগের আরও বেশ কিছু মামলা চলমান রয়েছে।
যে যেভাবে আইনের আওতায় : যুবলীগের সমবায়বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন জি কে শামীম। তার প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্স। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাজধানীর মতিঝিল, সবুজবাগ, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী একজন ঠিকাদার হয়ে ওঠেন তিনি। ‘টেন্ডার কিং’ হিসেবেও পরিচিতি পান তিনি। গণপূর্তসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও ছিল তার অবাধ দাপট। শামীমকে গ্রেপ্তারের পর এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সভাপতি (পরে বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ আরও অনেকেই গ্রেপ্তার হন। এর ধারাবাহিকতায় জি কে শামীমকেও গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর বেরিয়ে আসতে থাকে তার একের পর এক অপকর্মের কাহিনী। চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে টেন্ডারবাজিসহ অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার অভিযোগ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে, যা তদন্তেও উঠে আসে।
ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানের নিকেতনে অভিযান চালিয়ে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে দেহরক্ষীসহ জি কে শামীমকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় প্রায় দুই কোটি টাকা, পৌনে দুইশ কোটি টাকার এফডিআরের (ব্যাংকে স্থায়ী আমানত) নথি, আগ্নেয়াস্ত্র ও মদ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অবৈধ অস্ত্র, মাদক, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে অস্ত্র ও অর্থ পাচার মামলায় জি কে শামীমসহ গ্রেপ্তার সবাইকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া মাদক ও দুর্নীতির মামলায় শুধু জি কে শামীমকে আসামি করা হয়। অস্ত্র আইনের মামলায় তদন্ত শেষে ওই বছরের ২৬ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় র্যাব।
অভিযোগপত্রে জি কে শামীমের দেহরক্ষীদের তার দুষ্কর্মের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আসামিরা নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত হলেও তারা শর্ত ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও ব্যবহার করে লোকজনের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক ও জুয়ার ব্যবসা করে স্বনামে-বেনামে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাইসেন্স পেয়েছেন দাবি করে আসামি আমিনুল ইসলাম কাগজপত্র দেখালেও তা যাচাই করে সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই তার অস্ত্রটি অবৈধ। তিনি ওই অবৈধ অস্ত্রের নকল কাগজপত্র নিয়ে ২০১৭ সালে প্রথমে এস এম বিল্ডার্স কোম্পানিতে যোগ দেন। পরে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি আসামি জি কে শামীমের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ১৯ (ঙ) / ২১ / ২৩ ধারার অভিযোগ আনা হয়।
২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি ৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয় আদালত। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলায় তাদের বিচার শুরুর আদেশ দেয় অদালত। রাষ্ট্রপক্ষে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। মামলার সর্বশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে গত ২৮ আগস্ট রায়ের জন্য দিন ধার্য করে আদালত।
প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন আইনজীবী ও জি কে শামীম : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জি কে শামীমের আইনজীবী শাহীনুর ইসলাম অনি সাংবাদিকদের বলেন, তার মক্কেল ন্যায়বিচার পাননি। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সালাউদ্দিন হাওলাদার এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
রায়ের পর উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে জি কে শামীম বলেন, ‘আমাকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমি নির্দোষ। গভীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’ আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কেন করা হয়েছেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্বার্থের জন্য আমার সিন্ডিকেটের লোকজন আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।’
