জাতীয় সংসদসহ যেকোনো নির্বাচনেই নিরপেক্ষ থাকে না পুলিশ। নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে বলে অভিযোগ করেছেন নির্বাচন কমিশনাররা। এ ছাড়া অর্থ বরাদ্দ দিলে সঠিকভাবে তা খরচ হয় না। ভিন্ন খাতে তা খরচ করে ফেলে। এক কমিশনারের এমন মন্তব্য নিয়ে বাগবিতন্ডার সৃষ্টি হয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের বৈঠকে। গতকাল শনিবার নির্বাচন কমিশনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তবে পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, আমরা চেষ্টা করি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ বাধ্য করে তা সত্য। ঢালাওভাবে অভিযোগ করা ঠিক হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকদের নিয়ে বৈঠক করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল সকাল ১০টায় আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আহসান হাবিব খান (অব.), বেগম রাশেদা সুলতানা, মো. আলমগীর ও মো. আনিছুর রহমান, ইসি সচিব, ডিসি-এসপি ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আখতার হোসেন ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম।
জানা গেছে, সভায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সুপার বক্তব্য রাখেন। তার মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, যশোর, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলা, বরিশাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এসপি খোলামেলা বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, সামনে জেলা পরিষদ নির্বাচন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা মাঝেমধ্যে বাধার সৃষ্টি করেন। তাদের কারণে প্রায়ই সমস্যা হয়। এখানে নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। এমন এমন ভোটকেন্দ্র আছে সেখানে কিছুই নেই। ৫০ বছর আগের ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত আছে। ওইসব কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তা দেওয়া যায় না। ঝড়-বৃষ্টির সময় নানা সমস্যা হয়। আবার দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোয়ও সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে যাতায়াতের সমস্যা হয় বেশি।
নির্বাচনে যে বাজেট ধরা হয় তা দিয়ে নিরাপত্তাকাজে ব্যাঘাত ঘটে। আগামী নির্বাচনে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি করেন পুলিশ সুপাররা। এ সময় নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, পুলিশের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তা সঠিকভাবে ব্যয় হয় না। ভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়। এই অভিযোগ করার সময় সব এসপি এর প্রতিবাদ করেন। তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেন পুলিশ সুপাররা। তবে আনিছুর রহমান বক্তব্য প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানান। মিনিট পাঁচেক এই নিয়ে কিছুটা হইচই হয়। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশনার যেভাবে বলেছেন মনে হয়েছে পুলিশ বরাদ্দ হওয়া অর্থ লুটপাট করে ফেলে। আমরা কোনো কাজ করি না। তিনি এভাবে বলতে পারেন না। তার অভিযোগটির আমরা তীব্র প্রতিবাদ করেছি। তবে তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেননি।
আরও কয়েকজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে না। এই অভিযোগটিরও আমরা বিরোধিতা করেছি। ঢালাওভাবে অভিযোগ করা হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। তবে একটি বিষয় সত্য মাঝেমধ্যে কিছু পুলিশ নির্বাচনে কিছু প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে। সবাই তো কাজ করে না। তারা আরও বলেন, সিইসি পুলিশ নিয়ে সুন্দর সুন্দর কিছু কথা বলেছেন। আমরা কমিশনকে বলেছি, স্থানীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ করেন। নির্বাচন কমিশন বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ না করলে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না।
তবে আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনে কঠোরভাবে মনিটরিং করবে বলে জানিয়েছে কমিশন। তারা বলেছেন, স্থানীয় কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা যদি কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেন তাহলে আইনের মধ্যে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। সামনের প্রতিটি নির্বাচনে পুলিশ শতভাগ নিরপেক্ষ থাকার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে বৈঠকে।
বৈঠকটি প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে চলে। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, জেলা প্রশাসকদের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। তারাও মাঝেমধ্যে সঠিকভাবে কাজ করেন না।
বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, আপনারা (পুলিশ) সরকারের অবাধ্য হবেন না। কিন্তু সরকার ও দলের মধ্যে প্রভেদ বিবেচনায় রেখে দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। আপনারা কেবল সরকারি কর্মচারী নন, গণকর্মচারীও। আমরা সরকারি কর্মচারী নই, কিন্তু গণকর্মচারী। দলীয় সরকারের অধীন মনে করে নিজেদের দলীয় কর্মী বা সমর্থক ভাববেন না বা এমনভাবে আচরণ করবেন না যাতে সরকারি বা গণকর্মচারী হিসেবে আপনাদের দলনিরপেক্ষতা জনগণের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সরকার ও দল এক নয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটে দেওয়া বরাদ্দের চেয়ে আরও ১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা চেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। অর্থ বিভাগে দেওয়া চিঠিতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ বাহিনীর যেসব দাঙ্গা-দমনসামগ্রী ও অপারেশনাল সামগ্রী রয়েছে তা নিতান্তই অপ্রতুল। দাঙ্গা-দমনসামগ্রী ও অপারেশনাল সামগ্রী পুলিশে সংযুক্ত না হলে আগামী সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের জানমালের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়া দুরূহ হবে। তাছাড়া মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও বিঘ্নি ত হবে।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে জননিরাপত্তা খাতের জন্য সরকার ২৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা বেশি প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা। আর গত অর্থবছরের চেয়ে এবার ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে।
