শর্তের বেড়াজালে আটকে প্রাথমিকে শিক্ষকদের বদলি

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫০ এএম

প্রায় আড়াই বছর বন্ধ থাকার পর শুরু হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম। তবে এখন আর ম্যানুয়াল আবেদনে বদলির সুযোগ নেই। বদলি কার্যক্রম চলছে অনলাইনে। শিক্ষকদের সঙ্গে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের (এটিইও) বদলিও চালু করা হয়েছে অনলাইনে। কিন্তু নতুন বদলি নির্দেশিকার কয়েকটি শর্ত ও নীতিমালার কারণে বেশিরভাগই আবেদন করতে পারছেন না। ফলে বদলি নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে চার লাখ শিক্ষক ও আড়াই হাজার এটিইও’র মধ্যে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অনলাইনে বদলি কার্যক্রম পরিচালনা করতে গত ১১ সেপ্টেম্বর ‘সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা ২০২২’ জারি করা হয়েছে। এর আলোকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বদলির আবেদন শুরু হয়েছে। দুই দফা সময় বাড়িয়ে গত ৬ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদন করতে পেরেছেন শিক্ষকরা। তবে এখনো ঢাকাসহ ১১টি মহানগরের বদলি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বদলি নীতিমালা সংশোধনের কথা ভাবছি। তবে এ দফায় পরিবর্তিত নীতিমালায় আবেদনের সুযোগ থাকছে না। কারণ বদলি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামীতে যখন আবেদন গ্রহণ করা হবে, তখন থেকে সংশোধিত নীতিমালায় আবেদন নেওয়া হবে।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত আরও বলেন, ‘এটিইও’দের পদোন্নতির বিষয়েও সিনিয়র সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। কিন্তু তারা একাধিক মামলা করে রেখেছে। তারা যদি মামলাগুলো তুলে নেয়, তাহলে আমরা তাদের পদোন্নতির দিকে যেতে পারব। এ ব্যাপারে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলব। আর বদলি সাধারণত সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাহিদা বা সুবিধামতো জায়গায়ই করা হয়।’ সমন্বিত বদলি নির্দেশিকার ৩ নম্বর ধারার ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে চার বা তার কম শিক্ষক কর্মরত আছেন, কিংবা প্রতি ৪০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন, সেসব বিদ্যালয় থেকে সাধারণভাবে শিক্ষক বদলি করা যাবে না।

শিক্ষকরা বলছেন, নির্দেশিকার এই শর্তের কারণে বেশিরভাগ শিক্ষক বদলির জন্য আবেদন করতে পারছেন না। এ নীতিমালায় কোনো শিক্ষকের স্বামী-স্ত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী হলে, তার স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থলে বদলির সুযোগও রাখা হয়নি। আগের নির্দেশিকায় উপজেলার বাইরে থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষক বদলির সুযোগ থাকলেও বর্তমান নির্দেশিকায় করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক উপজেলার বাইরে থেকে বদলি হয়ে আসার সুযোগ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ারুল ইসলাম তোতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বদলি নীতিমালায় কঠিন শর্তের কারণে ৯০ শতাংশ শিক্ষকই আবেদন করতে পারেননি। অথচ আড়াই বছর ধরে বদলি বন্ধ। অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছেন। অনেকের বিয়ে হয়েছে, স্বামীর বাড়ির কাছাকাছি যাবেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই বদলির আবেদন করতেই পারছেন না। আমরা বদলি নীতিমালা সংশোধন ও আবেদনের সময় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।’

জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের গ্রেড পরিবর্তন হলেও গত ২৮ বছর ধরে গ্রেড বদলায়নি সহকারী উপজেলা বা থানা শিক্ষা অফিসারদের (এইউইও/এটিইও) পদ। ফলে তাদের এতদিন নিজ জেলার বাইরে বদলি করা হতো না। কিন্তু বর্তমানে তাদের অনলাইন বদলির আওতায় এনে নিজ জেলার বাইরে বদলির উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে দেশের ২ হাজার ৬০১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মধ্যে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অ্যাসোসিয়েশন গ্রেড উন্নীত এবং পদোন্নতির দাবিতে সরব হয়েছে। স্মারকলিপি দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। সেখানে তারা দশম গ্রেড থেকে নবম গ্রেডে উন্নীত করার পাশাপাশি ১০০ ভাগ পদোন্নতির সুযোগ প্রদানের দাবি জানিয়েছে।

এটিইওরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা পাঠদান করেন তাদের তত্ত্বাবধানের সার্বিক দায়িত্ব থাকে এইউইও বা এটিইও’দের। এই পদটি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে দশম গ্রেডে রয়েছে। সীমিত করে দেওয়া হয়েছে পদোন্নতির সুযোগও।

সূত্র জানায়, ১৯৯৪ সালে এইউইও’দের পদটি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়। ওই সময় প্রধান শিক্ষকের পদটি ১৪তম গ্রেডে এবং সহকারী শিক্ষক পদটি ১৮তম গ্রেডে ছিল। প্রধান শিক্ষক পদটি তিন দফায় উন্নীত করার ফলে ২০১৪ সালে ১১তম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষক পদটি চার দফায় ২০২০ সালে ১৩তম গ্রেডভুক্ত হয়। একই সময়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পদটি ৯ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট পদটি ৯ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে এবং পিটিআই ইন্সট্রাক্টর পদটি ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ২৮ বছর পর্যন্ত সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার পদটি ১০ম গ্রেডেই রয়ে গেছে।

এ ছাড়া ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার পদ থেকে উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতির সুযোগ ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু ১৯৯৪ সালে সেটি কমিয়ে করা হয়েছে ২০ শতাংশ। অথচ সহকারী শিক্ষা অফিসার ও শিক্ষা অফিসার পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতি একই।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমএএস রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পদ ৯ম গ্রেডে উন্নীত করলে দেশের কোথাও বদলি হতে কোনো আপত্তি নেই। তারপরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, নিজ জেলার বাইরে বদলি করলেই কী শিক্ষার মান রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যাবে। বরং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে থেকে চাকরি করলেই শতভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব।’

বাংলাদেশ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের একজন কর্মকর্তা প্রায় ৩০টি স্কুল মনিটরিং করেন। এতে একজন কর্মকর্তাকে প্রায় ২০০ শিক্ষক এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সুযোগ-সুবিধা দেখভাল করতে হয়। বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের ছুটি মঞ্জুর, অ্যাকাডেমিক তত্ত্বাবধান, মনিটরিং ও মেন্টরিংয়ের পাশাপাশি উপজেলার অন্যান্য সরকারি কাজেও সহযোগিতা করতে হয়। তাই আমাদের পদটি ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।’

জানা যায়, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৬টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় চার লাখ। বর্তমানে ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান। দু’এক মাসের মধ্যেই তাদের নিয়োগও সম্পন্ন হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত