‘ভাই, আমার একটি পা নেই। ডায়াবেটিস আছে, একবার স্ট্রোক করেছি এ সব নিয়েই ২২ বছর ধরে মামলা চালাচ্ছি। মামলাটা শেষ হতে আর কত দিন লাগবে বলতে পারেন?’ প্রশ্নটা জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার এক পা বিহীন শফিকুল ইসলামের। কারণ, হাজার হাজার মামলার জটে থমকে আছে জয়পুরহাটের জেলা জজ আদালত।
জানা যায়, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষী সময়মতো হাজির না হওয়াসহ নানা কারণে বিচার প্রক্রিয়ায় হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা। বাদী-বিবাদীরা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, আদালতে হাজিরা দিয়েও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় হতাশ। অপরদিকে, তদন্ত প্রতিবেদনের ধীর গতির কারণে মামলা জট হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আইনজীবীরা।
আদালত সূত্রমতে, জয়পুরহাট জেলা ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন মামলার সংখ্যাও একেবারে কম নয়। এ ছাড়া জমিজমা সংক্রান্ত মামলাও রয়েছে অনেক। তবে ফৌজদারি মামলার সংখ্যাই বেশি। এ জেলায় বর্তমানে ৩৫ হাজারের বেশি মামলা চলমান। তারপরও প্রতিদিনই বাড়ছে মামলার সংখ্যা, কিন্তু হচ্ছে না নিষ্পত্তি। এতে আদালতে তারিখের পর তারিখ ঘুরে ঘুরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হতাশায় পড়ছেন মামলার দরিদ্র বাদী-বিবাদীরা। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির দাবি তাদের।
মামলার ভুক্তভোগী ক্ষেতলালের আবদুল কুদ্দুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, টাকা আত্মসাতের একটি মামলা করেছিলাম। ছয় বছর ধরে ওই মামলার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন বলেন, দুই শতক সম্পত্তি নিয়ে তিন বছর ধরে মামলা চালাচ্ছি। তারিখের পর তারিখ পাচ্ছি, রায় পাচ্ছি না। মামলা চালাতে গিয়ে জমিটার চেয়ে তিন গুণ টাকা বেশি খরচ হয়ে গেছে। একই রকম কথা বলেন জয়পুরহাট শহরের জাকিয়া সুলতানাসহ অনেক মামলার বাদী-বিবাদীরা।
জয়পুরহাট জজ কোর্টের আইনজীবী খলিলুর রহমান মণ্ডল, সুশান্ত কুমার, মানিক হোসেনসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ হলো মামলা তদন্তের ধীর গতি। মামলা তদন্তে কর্মকর্তার কোনো বাইনডিংস নেই। ইচ্ছামতো সময় বাড়ায়, যথা সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে না। মামলার তদন্তকারী সংস্থা আলাদা করা দরকার, যাদের কাজ হবে শুধুই তদন্ত করা। তবেই মামলার জট কমবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। আরেকটি বিষয়, দেড় শ বছর আগের আইন দিয়ে বিচার কার্য পরিচালনা করা হচ্ছে, যেটা বর্তমান সময় অনুযায়ী উপযোগী নয়।
জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, জয়পুরহাট আদালতে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৩৫ হাজার মামলা বিচারাধীন। বিভিন্ন কারণে তদন্ত প্রতিবেদন সময় মতো আদালতে জমা হয় না। মামলার সাক্ষী যথা সময়ে আসে না। এ ছাড়া করোনার কারণে প্রায় দুবছর উল্লেখযোগ্য বিচার হয়নি। যার জন্য বিশাল একটি মামলার জট লেগে আছে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা থাকতে হবে। বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় লিগ্যাল এইড সার্ভিসের মাধ্যমে কিছু মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে।
