মাকে বাঁচাতে বিক্রি হতে চায় ছেলে

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২২, ০৬:২৭ এএম

মায়ের মতো আপন কেহ নাইএ কথাই আবার প্রমাণ করলেন বান্দরবান সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ইতিহাস বিভাগে শিক্ষার্থী আনোয়ারুল ইসলাম মামুন। তার মা ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতিমধ্যে ১৪ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখনো চিকিৎসা চলছে। মাকে বাঁচাতে এবং ক্যানসারের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ মেটাতে ১০ বছরের জন্য শ্রমিক হিসেবে নিজেকে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন মামুন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে পোস্ট দেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের আমতলী পাড়ায় থাকেন মামুন। বাবা বৃদ্ধ। আগে কৃষিকাজ করলেও এখন অসুস্থতার কারণে তা করতে পারেন না। আলীকদমের ভাঙাচোরা ঘরে থাকেন তারা। তবে লেখাপড়া ও কাজের সুবিধার্থে মামুন থাকেন বান্দরবানের নিউগুলশান এলাকার একটি ভাড়া বাসায়।

তিন মাস আগে মা খালেদা বেগমের জরায়ু ক্যানসার ধরা পড়ে। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক এম এ আউয়ালের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ক্যামোথেরাপি দেওয়া হয়। তার বাম পাশের কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। ডান পাশেরটা চলমান রাখার জন্য অপারেশনের মধ্য দিয়ে পাইপ বসানো হয়েছে। এ পর্যন্ত মায়ের চিকিৎসা করাতে ১৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে তার ব্যক্তিগত ৮ লাখ টাকা আর বাকিটা ধার নেওয়া।

উপায় না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রমিক হিসেবে নিজেকে ১০ বছরের জন্য বিক্রি করার ঘোষণা দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন আনোয়ারুল ইসলাম মামুন।

মামুন এই প্রতিবেদককে বলেন, পরিবারের হাল ধরতে গত ৬ বছর ধরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। এরই মধ্যে আমার মা অসুস্থ হয়। গত চার মাস হলো মায়ের ক্যানসার হয়েছে। এক মাস আমি প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি নিই। কিন্তু মায়ের দীর্ঘ অসুস্থায় তার পাশে থাকার কারণে চাকরিটাও চলে যায়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ক্যামোথেরাপি দিতে হয়। আইসিইউতে ভর্তি করাতে হয়। শেষ পর্যায়ে ডাক্তার বলছেন মায়ের পুরো শরীরের ক্যানসারের জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছে।

মামুন আরও বলেন, অনেক কষ্ট থেকে আমি ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছি। আগামী ১০ বছরের জন্য নিজেকে শ্রমিক হিসেবে বিক্রি করতে চাই। বৈধ উপায়ে যেকোনো কাজ করব। আমার কাছে আমার বাবা-মা অনেক বড়। আমি সবসময় চেয়েছি তাদের ভালো রাখতে। আমি প্রতি ঈদে পুরাতন কাপড় পরেছি, কিন্তু আমার বাবা-মাকে নতুন কাপড় দিয়েছি। আমার মায়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমি স্ট্যাটাস দিয়েছি।

মায়ের চিকিৎসার বিষয়ে মামুন আরও বলেন, আমার মায়ের কিছুদিন আগে টাইফয়েড হয়েছিল। টাইফয়েড চিকিৎসা করিয়েছি একটি বেসরকারি হাসপাতালে। এখন চট্টগ্রামে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে রেখেছি। আমার চাকরি নেই, এখন কোনো আয় নেই।

তিনি আরও জানান, আমার পিতা আমাকে পড়ালেখা করিয়েছেন। উন্নত শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি এখন বৃদ্ধ। আগে কৃষিকাজ করতেন। এখন চলাফেরা করতে পারেন, তবে কাজ করতে পারেন না। উনিও অসুস্থ । 

তিনি আরও বলেন, সমাজের বিত্তবানরা যদি আমার মায়ের জন্য সহযোগিতা করেন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। গ্রামে অল্প কিছু জায়গা আছে মায়ের চিকিৎসার জন্য সেই সম্বলটুকু বিক্রি করে দেব। অন্যদেরও সহযোগিতা চাই ।

এরই মধ্যে তিনি সহযোগিতার জন্য ০১৩২১১৯৯৬২৮ একটি বিকাশ নম্বর দিয়েছেন।

আলীকদম সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, মামুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে শ্রমিক হিসেবে ১০ বছরের জন্য বিক্রির কথা বলে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সে আমার পরিচিত। তার মায়ের চিকিৎসার জন্য এরই মধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। সমাজের বিত্তবান সবাই তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সহযোগিতা করা উচিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে সাহায্য করব।

ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর মায়ের চিকিৎসায় কেউ এগিয়ে এসেছে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে মামুন বলেন, স্ট্যাটাস পেয়ে অনেকে ছোট ছোট টাকার অ্যামাউন্ট নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার টাকার মতো পেয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত