ইসলাম সালিশি বৈঠককে স্বামী-স্ত্রীর কলহ-বিবাদ দূর করার ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট ও বাস্তবমুখী পদ্ধতি বলে ঘোষণা করেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ সৃষ্টির আশঙ্কা করো, তবে (তাদের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য) পুরুষের পরিবার থেকে একজন সালিশ ও নারীর পরিবার থেকে একজন সালিশ পাঠিয়ে দেবে। তারা দুজন যদি মীমাংসা করতে চান, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত এবং সর্ব বিষয়ে অবহিত।’ সুরা আন নিসা : ৩৫
অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী নিজেরা পারস্পরিক কলহ-বিবাদ মেটাতে অপারগ হলে অভিভাবকদের সহযোগিতা নেবে। উভয় পক্ষের অভিভাবকরা একত্র বসবেন। প্রয়োজনে কোনো জনপ্রতিনিধি সঙ্গে নেবেন। সবাই ঠান্ডা মাথায় স্বামী-স্ত্রীর বক্তব্য ও অভিযোগগুলো শুনবেন। অতঃপর ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নিয়ে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ দূর করার চেষ্টা করবেন। সালিশি বৈঠক নিঃস্বার্থভাবে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করলে আল্লাহ অবশ্যই তাদের সংশোধন করে দেবেন। পুনরায় তাদের মধ্যে হৃদ্যতা ও ভালোবাসা দান করবেন।
ওপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসলামের দৃষ্টিতে সালিশি পরিষদের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক এবং ছাড়াছাড়ি হওয়ার আগে। ওই সময় তারা স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক অটুট রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করবেন। কিন্তু তালাক ও ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর সালিশি বৈঠকের তেমন কোনো গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ অবশিষ্ট থাকে না। অথচ আমাদের সমাজে এই উল্টো কাজটির প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর : ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা অনুযায়ী যে ব্যক্তি তালাক দেন, তিনি লিখিতভাবে তালাকের নোটিস স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন (চেয়ারম্যান, মেয়র) বরাবর ও স্ত্রী/স্বামীর কাছে একটি নোটিস পাঠান। নোটিস পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান/মেয়র সালিশি পরিষদ গঠন করেন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করেন। সালিশি পরিষদ উভয়কে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতি ৩০ দিনে ১টি করে ৩টি নোটিস প্রদান করেন। এর মধ্যে স্বামী নোটিস প্রত্যাহার না করলে তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, শরিয়ত সমর্থিত নিয়মে স্বামী যদি স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী নিজেকে তালাক দেয় এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলে সালিশি পরিষদ স্বামী কর্র্তৃক তালাক প্রত্যাহারের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলন ঘটাতে পারবে কি? ইসলাম কি তাদের এই এখতিয়ার দিয়েছে? স্বামীও কি তালাক প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখেন?
উত্তরে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, তালাক হয়ে যাওয়ার পর সালিশি পরিষদ কিংবা স্বামী কারও জন্য তালাক প্রত্যাহারের এখতিয়ার থাকে না। তবে সালিশি পরিষদের জন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বলবৎ রাখা অথবা নতুনভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা এগুলো নির্ভর করবে প্রদত্ত তালাকের ধরনের ওপর। এর তিনটি অবস্থা হতে পারে
এক. এক কিংবা দুই তালাকে রেজয়ি হলে ইদ্দতের ভেতরে সালিশি পরিষদের অনুরোধে অথবা স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই বৈবাহিক সম্পর্ককে বলবৎ রাখতে পারবে। অর্থাৎ সে ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীকে রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) করে নিলেই চলবে। নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে না। আর রুজু দুভাবে হয় ১. মৌখিকভাবে। যেমন আমি তোমাকে পুনরায় স্ত্রী রূপে গ্রহণ করলাম। ২. স্বামী-স্ত্রী সুলভ আচরণের মাধ্যমে। যেমন যৌন কামনার সঙ্গে চুমু খাওয়া, শরীর স্পর্শ কিংবা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। তবে উত্তম হলো দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে মৌখিকভাবে রুজু করা। ফাতাওয়া
শামী : ৫/২৭-২৮
দুই. এক কিংবা দুই তালাকে বায়েন হলে ইদ্দতের ভেতরে বা ইদ্দতান্তে নতুনভাবে স্বামী-স্ত্রী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেই পুনরায় বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হবে।
তিন. তিন তালাকে রেজয়ি কিংবা তিন তালাকে বায়েন হলে (চাই তা এক শব্দে হোক বা একাধিক শব্দে, এক কিংবা একাধিক মজলিশে) শরিয়ত সমর্থিত নিয়মে অন্যত্র বিয়ে ও শারীরিক সম্পর্ক করাসহ বেশ কিছু শর্ত পালন করা ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্বহাল কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সালিশি পরিষদ করলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে (স্ত্রীকে) (দুই তালাকের পর তৃতীয়) তালাক দেয় তবে সে তার জন্য বৈধ হবে না, যে পর্যন্ত সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে সঙ্গম না করবে।’ সুরা আল বাকারা : ২৩০
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করলে সে অন্যত্র বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক প্রদান করলে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, এই মহিলা কি তার প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে? উত্তরে বললেন, দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা ছাড়া হালাল হবে না। সহিহ বোখারি : ৫২৬১
তালাক রেজিস্ট্রার ও উকিলের সতর্কতা : কোনো কোনো তালাক রেজিস্ট্রার কাজী কিংবা উকিল তালাক নোটিস লেখার ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি ভুল করেন।
এক. এক তালাকে বায়েন না লিখে করে তিন তালাক লিখে দেন। এতে নোটিস পাওয়ার পর চেয়ারম্যানের জন্য তাদের মধ্যে সমঝোতা করা সম্ভব হয় না। আর করলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। কারণ তিন তালাক হয়ে গেলে নতুনভাবে বিয়ে পড়িয়ে দিলেই যথেষ্ট হবে না। বরং নির্দিষ্ট কিছু শর্তপালন করতে হয়, যা খুবই কঠিন বা কারও পক্ষে প্রায় অসম্ভব। পক্ষান্তরে এক কিংবা দুই তালাকে বায়েন দেওয়া হলে সমঝোতা করতে চাইলে নতুনভাবে বিয়ে করিয়ে দিলেই যথেষ্ট হতো। আর সমঝোতা সম্ভব না হলে অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে কোনো বাধা থাকত না।
দুই. স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের নোটিস লেখার ক্ষেত্রে স্ত্রী তালাক শব্দকে নিজের দিকে সম্বন্ধ না করে স্বামীর দিকে সম্বন্ধ করে। যেমন বলে, আমি স্বামীকে তালাক দিলাম। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রী তালাকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলে নিজেকে তালাক দিতে পারে, স্বামীকে নয়। কারণ তালাক পতিত হয় স্ত্রীর ওপর, স্বামীর ওপর নয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আমি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়ায় সে আমাকে তিন তালাক প্রদান করেছে। জবাবে ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, আল্লাহ তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছেন। কারণ তালাক তোমার ওপর হয় না বরং তোমার স্ত্রীর ওপর হয়। মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক
