বাজার তদারকিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন হবে?

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২২, ১২:২২ এএম

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা নিত্যপণ্যের বাজারদর বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের বাজার তদারকি বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। দেশের শাসনব্যবস্থায় এখন কোনো কিছুই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোছর ছাড়া হয় না। যদিও প্রশাসনিক কর্মবণ্টন ব্যবস্থায় সবকিছু উল্লেখ আছে, তারপরও প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

করোনা মহামারীর পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থা টালমাটাল। বাংলাদেশে সবকিছু বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভরশীল না হলেও পরিস্থিতি আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সে পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। ফলে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আগুনে পুড়তেই হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান উপকরণ চালের বাজার দীর্ঘসময় ধরেই অস্থির। দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় বহুল ব্যবহৃত আরেক খাদ্যপণ্য আটারও একই অবস্থা। এ দুটি খাদ্যপণ্যের দাম কোনোভাবেই কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। ফলে প্রান্তিক ও সাধারণ আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকা নির্বাহ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে, সরকার নিজে খাদ্য আমদানি করেছে, বেসরকারিভাবে আমদানির অনুমতি প্রদান করায় খাদ্য মজুদও যথেষ্ট পরিমাণে আছে ফলে কোনো ঘাটতি হওয়ার কথা নয়; তবু চাল কিনতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। এখানে উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঠিক তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে, হয়তো বাড়তি পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছে বা সিন্ডিকেট করে এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।

করোনা লকডডাউন পরবর্তী সময় থেকে আমাদের ব্যবসায়ীরা পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, বিশেষ করে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাতে দাম বাড়ানো শুরু করেন। এরপর এলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এবার আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যের দামবৃদ্ধির অজুহাতে আরেক দফা দাম বাড়ানো শুরু হয়। সর্বশেষ ডলার এবং জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে গম ছাড়া আর কোন কোন পণ্য আমদানি করা হয় তার সুর্নিদিষ্ট পরিসংখ্যান নেই কিন্তু দাম বেড়েছে প্রায় সব নিত্যপণ্যের। কার্যত, লকডাউন পরবর্তী সময়ের জাহাজ ভাড়া এখন অর্ধেকে নেমে এলেও পণ্যের দাম কমানোর পরিবর্তে নতুন নতুন অজুহাতে তা আরও বাড়ছে। ১০ টাকার সাবান ১৫ টাকা, ৫০ টাকার ডিটারজেন্ট পাউডার ১০০ টাকা বাড়ানোর যুক্তি কী? কসমেটিকস উৎপাদনকারী কোম্পানির প্রতিনিধিরা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের গণশুনানিতে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রশ্নের জবাব দিতে ব্যর্থ হলেও দাম বাড়াতে দেশি-বিদেশি সবগুলো কোম্পানি একজোট। আবার সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে দেশে উৎপাদিত সরিষার তেলের দামও দ্বিগুণ। ব্যবসায়ীরা সুযোগকে হাতছাড়া করতে চান না। কয়েকদিন আগে দেশব্যাপী ব্ল্যাকআউটের সময় ঢাকায় ১০ টাকার মোমবাতি এক ঘণ্টার মধ্যেই ৩০-৫০ টাকায় ঠেকেছিল। ২০০ টাকার এনার্জি বাল্ব এখন ৫/৬০০ টাকা। ১৫০০ টাকার চার্জার ফ্যান ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবেও বাজারে নিত্যপণ্যের অস্থিরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ দুই মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি রয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলছে, ‘মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় চাপে পড়েছে গরিব মানুষ। এ অবস্থায় নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।’ বিষয়টি ন্যায্যমূল্যে টিসিবির খাদ্য-পণ্য বিক্রির ট্রাকের সামনে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ভিড় দেখলেই বোঝা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানিকৃত হোক বা দেশে উৎপাদিত হোক ভোগ্যপণ্যের  দাম বৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং স্বল্প আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে পণ্য ব্যবহার কমিয়েছে। প্রান্তিক ও সাধারণ আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। অনেকে একবেলা খেয়ে বেঁচে আছেন, যা পুষ্টিহীনতাসহ কর্মক্ষমতা হ্রাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ফল হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় রাখতে চেষ্টা চালানোর কথা বলেছেন। সামনের বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুরবস্থা আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারপ্রধান দেশবাসীকে সঞ্চয়ী মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৩ সাল বিশ্বের জন্য সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ একটা বছর বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ওই সময় দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।’ ফলে আমাদের এখন থেকেই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য সংরক্ষণের কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে বা প্রক্রিয়াজাত করা যেতে পারে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

নিত্যপণ্যের বাজারদর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ এবং একে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে। এটা ভুলে গেলে চলবে না, সরকারের প্রধান শক্তি জনগণ। জনগণ ভালো থাকলে সরকারও ভালো থাকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন ও সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাজারে অস্থিরতার তাৎক্ষণিক সমাধান মিলবে।

নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন খুবই দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, একশ্রেণির ব্যবসায়ী সংকটময় পরিস্থিতিকে পুঁজি করে, অতি মুনাফালাভের মনোবৃত্তির কারণে তারা নিজেরা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বাজার অস্থির করছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ অতি মুনাফার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তবে অতিমুনাফাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না অজানা কারণে। ফলে নিত্যপণ্য নিয়ে অস্থিরতা প্রলম্বিত হচ্ছে মাসের পর মাস। চক্রাকারে সবগুলো খাদ্যপণ্যে মূল্যবৃদ্ধির অশুভ চর্চাটির সামাজিক সংক্রমণও ঘটেছে। দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে হাপিত্যেশ থাকলেও সমাধানের পথে কেউ হাঁটছে না।

পণ্যমূল্য যাতে সাধারণ ভোক্তাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে তার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে বর্তমান চলমান ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় চাল, আলু ও দেশি পেঁয়াজ বিক্রির পরিধি বাড়াতে হবে। এছাড়া টিসিবির আওতায় বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্য স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সরকার টু সরকার পর্যায়ে সংগ্রহ করার নীতি চালু করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারকে জেলা প্রশাসন, খাদ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পাদ ও ভোক্তা অধিদপ্তরের সমন্বিত বাজার তদারকি জোরদার, উৎসস্থল, মিল মালিক ও উৎপাদক পর্যায়ে বাজার তদারকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদেরসহ ভোক্তাদের সমঅংশগ্রহণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নিত্যপণ্যের বাজার তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সরকারের অন্যান্য নির্দেশনার মতো রুটিন নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা না করে অতি জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তাহলেই বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা ও খাদ্য ঘাটতির মতো কঠিন বাস্তবতা আমরা মোকাবিলা করতে পারব।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত