মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রতারণার ধরন ও প্রতারিত হলে যা করবেন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ১১:৪৮ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের তরুণ প্রজন্ম আর এদের মধ্যে অশ্লীল ট্রলের শিকার হচ্ছে তরুণীরা। অপরাধ হিসেবে  সাইবার আক্রমণ বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতার হার মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে হোয়াইট কালার ক্রাইম হিসেবে ক্ষতিগ্রস্তর বেশির ভাগই আইনি আশ্রয় নিতে অনিচ্ছুক। হোক সেটা আমাদের সচেতনতার অভাব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দীর্ঘ মেয়াদি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব। সাধারণত ঝামেলা এবং সামাজিক কলঙ্কের ভয়ের কারণে  ভিকটিম নীরব থাকায় এই ধরনের অপরাধ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারই কয়েকটি অপরাধের ধরন দেওয়া হলো। 

মদিনা ট্রাভেলস প্রতারণা

আর্থিক প্রতারণায় ফেসবুক হ্যাক করে বা ভিকটিমের ফেসবুকের কপি করে বন্ধুকে ম্যাসাঞ্জারের মাধ্যমে মদিনা ট্রাভেলসের নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে বিকাশে টিকিটের জন্য টাকা ধার চাইতো এক প্রতারক। প্রতারকের ম্যাসাজ ছিল এমন যে, তিনি বিদেশ থেকে দেশে আসছে, তার ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামবে, চট্টগ্রাম থেকে ওই দিনই ঢাকায় আসবে, মদিনা ট্রাভেলসে টিকিট বুকিং আছে দেরি হয়ে গেলে টিকিট বাতিল হয়ে যাবে। বিকাশে টাকা পাঠালে প্রতারক তার মেইলে টিকিট পেয়ে যাবে। কেউ টাকা পাঠালে মোবাইল বন্ধ অথবা তাকে বলা হতো টাকা আসেনি আবার পাঠান। এরপরে মোবাইল বন্ধ। এই ধরনের কয়েকটি সংবাদ আসলে অনুসন্ধান শেষে নীলফামারী জেলার গঙ্গামারী এলাকা থেকে এ ধরনের অপরাধ পরিচালিত হয়। অবশেষে অপরাধের মূল হোতা রকিসহ ৯ জনকে আটক করা হয়। তারা সকলেই ২০ থেকে ৩০ বছরের যুবক। রকি একটি প্রাইভেট কারের মালিক। এই সকল অপরাধী ফেনসিডিলসহ অন্যান্য নেশায় মশগুল থাকে। তারা আপরাধ কাজে ব্যবহার করার জন্য কয়েক দিন আগে যমুনা ফিউচার পার্কে এসেছিল মোবাইল কিনতে। সেখান থেকেই রকিদের আটক করা হয়। অবশ্য রকির অপরাধপ্রবণ কাজে অনেক তরুণ দীক্ষা নিয়েছে। ওই এলাকায় রকি ছিল একজন দানশীল তরুণ। তাকে আটক করে নিয়ে আসার সময় এলাকাবাসী হতাশ হয়ে যান। এ ধরনের অপরাধ কিন্তু থেমে যাবে না। রকি অনেক সদস্য তৈরি আছে। জামিনে বের হয়ে আবার এ পেশাতেই ভিন্ন এক আবরণে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করবে।  

ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড প্রতারণা

ইদানীং মোবাইল ব্যাংকিং সেক্টরে ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার মহা উৎসব চলছে। মোবাইলে কল করে ব্যাংকের কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে খুব স্মার্টভাবে বলবে 'আপনার কার্ড Overdue Payment এর কারণে ব্লক করা আছে। আপনি এই কার্ডটি ব্যবহার করতে চান কি না, যদি চান আমাকে কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন, আমি কার্ড একটিভ করে দিচ্ছি।' আপনি সরল মনে কিছু তথ্য OTP (One Time Password) প্রদান করলেই আপনার ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড হতে টাকা হাওয়া। এরপরে হয়তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হতে অ্যাপের বা হট লাইনের ফোন আসবে আপনার কার্ড হতে Transction হয়েছে, Transction আপনার দ্বারা হয়েছে কি না? ভুক্তভোগী না সূচক জবাব দিলে সংশ্লিষ্ট ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড এর ব্যাংকের কর্মকর্তারা আপনার অ্যাকাউন্টের টাকা লেন-দেন বন্ধ করে দেবেন। 

এরপরে পুলিশের দ্বারস্থ হলেন। যে ভাবেই হোক থানা-পুলিশে অভিযোগ দায়ের করলেন। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আপনি যদি সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন এমন কোন পুলিশের কাছে ওভার ফোনে ঘটনাটি জানিয়ে দেন  তাহলে আপনার প্রতারিত টাকা ফেরত পাওয়ার সামন্য আশা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে আপনি প্রতারকের মোবাইল নম্বর সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন এমন পুলিকে অফিসারকে সরবরাহ করবেন। সাইবার পুলিশ অফিসার সঙ্গে সঙ্গেই বিকাশ বা অন্য কোন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য নির্ধারিত মোবাইলে যোগাযোগ করে প্রতারিত হওয়া টাকা সাময়িকভাবে জব্দ করে রাখবেন। এরপরে নিকটস্থ থানায় গিয়ে প্রতারকের ওই মোবাইল নম্বরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বা দণ্ড বিধিতে মামলা করতে পারেন। তবে এ ধরনের মামলা তদন্ত করার জন্য সব থানায় লোকবল নেই বিধায় থানা-পুলিশ মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করে থাকেন। 

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তদন্তের শুরুতেই অভিযুক্ত মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইলস রেকর্ড সহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে অনেক অসত্য তথ্য দেখতে পেলেন। একজন গ্রাম্য মহিলার নামে সিম রেজিস্ট্রেশন করা, তার যে ঠিকানায় থাকার কথা সেই ঠিকানায় তার অবস্থান নেই। মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসগুলি হতে তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পেলেন দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা খরচসহ সেন্ড মানি করার পরেই ক্যাশ আউট করা হয়েছে। ঘাবড়াবেন না এখান থেকেই আমাদের অভিযান শুরু হবে। প্রতিদিনই পরিচিত জনদের অল্প-স্বল্প টাকা বিকাশ প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার সংবাদে আমরা অভ্যস্ত। একদিন তিনটি সংবাদ আসে ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড হতে টাকা ৫০ হাজার করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার। অভিযানের শুরুতেই জানা যায় যে প্রতারক চক্র কৌশলে গ্রাহকের ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড এর নম্বর এবং মেয়াদোত্তীর্ণ এর তারিখ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে OTP নেওয়া মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিকাশের অ্যাড মানির মাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন মার্কেট পেলসের অ্যাপে টাকা নিয়ে রাখে। বিকাশ প্রতারকেরা আজকাল শিক্ষা বোর্ডে উপ-বৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

প্রতারক চক্র শিক্ষা বোর্ডের ওয়েব সাইট থেকে উপ-বৃত্তির টাকা প্রাপ্তদের তালিকা মোবাইল নম্বরসহ ডাউনলোড করে নিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারকচক্র শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে কৌশলে ডেভিড কার্ড বা ক্রেডিট কার্ড এর তথ্য সংগ্রহ করে টাকা হাতিয়ে নেয়। এ সকল  অপরাধের  ধরন পর্যালোচনা করে অপরাধীদের  শনাক্ত করা হয়। আটক করা হয় অপরাধের মূল হোতাসহ তাদের সহযোগী অপরাধীদের। বিচিত্র এদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। নিরীহ লোকের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে মোবাইল সীম সংগ্রহ এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট করা। দেশের বিভিন্ন এলাকায়  টাকা সংগ্রহ করার জন্য বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ করা হয়। তারা দুইভাবে মূল প্রতারককে টাকা প্রদান করে। নগদ টাকায় প্রতারিত বিকাশের টাকা কিনে নেওয়া বা ২০% হারে টাকা নেওয়ার শর্তে টাকা সংগ্রহ করা। এসব প্রতারকের আবাসস্থল ফরিদপুর জেলার ভাঙা থানা এলাকার জাঙ্গলপাশা গ্রামে। এখানকার তরুণদের কি কাজ কেরে জিজ্ঞেস করলে বলে 'বিকাশে কাজ করি'। 'বিকাশে কাজ করি' পরিচয় নিয়ে প্রতারকচক্র স্বচ্ছল পরিবারের মেয়েদের বিয়ে-সাদি করে থাকে। এই বেপরোয়া প্রতারকদের কবল থেকে সাধারণ মানুষদের অর্থ-সম্পদ রক্ষা করতে সাইবার ক্রাইম তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে অভিজ্ঞতার আলোকে দু’টি প্রস্তাবনা অবতরণ করা হলো। 

(ক) অবৈধ সিম দিয়ে যে সকল মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালিত হচ্ছে সে সকল সিম বন্ধ করাসহ বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মোবাইল কোম্পানির চুক্তি মোতাবেক সকল সিম জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বিক্রয় করতে হবে এবং সিম বিক্রি করার পরে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ব্যতীত কোন সিম দিয়ে অনলাইন ব্যাংকিং নিষিদ্ধ করতে হবে। 

(খ) মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোন লেন-দেন করা হলে ২৪ ঘণ্টা পরে প্রেরিত টাকা উত্তোলনযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। 

লেখক: পুলিশ ইন্সপেক্টর ও সাইবার ক্রাইম তদন্তকারী কর্মকর্তা, সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, সিটিটিসি, ডিএমপি, ঢাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত