পাকিস্তানি বাহিনী তুলে নেওয়ার পর আর ফেরেননি

৫১ বছরেও স্বীকৃতি পাননি প্রসন্ন ভৌমিক

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২২, ১২:৪০ এএম

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ। প্রতিদিনের মতো নিজ কর্মস্থল আদালতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অ্যাডভোকেট প্রসন্নকুমার ভৌমিক। তখন সকাল ১০টা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ বাসায় ঢোকে একদল পাকিস্তানি সেনা। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গোসলখানা থেকে ভেজা কাপড় নিয়েই বের হন প্রসন্নকুমার। খাটে থাকা দেড় বছরের কন্যাশিশু ফাল্গুনীকে কোলে নেন। পাশে দাঁড়ান স্ত্রী রেখা ভৌমিক। পাকিস্তানি সেনারা বলতে থাকে দ্রুত তাকে গাড়িতে তুলতে। কোলের শিশুকে টেনে নামিয়ে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের স্বপ্নপুরীর বাসা থেকে প্রসন্নকুমার ভৌমিককে গাড়িতে তোলে তারা। সঙ্গে স্বপ্নপুরীর বাসার স্বত্বাধিকারী যতীন্দ্রনাথ ভদ্র এবং তার দুই ছেলে কাজল দেবনাথ ও রতন দেবনাথকেও গাড়িতে তুলে কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। এরপর থেকে প্রসন্নকুমার ভৌমিকসহ কারোরই আর খোঁজ মেলেনি।

৫২ বছর আগের নির্মম দুঃসহ স্মৃতি এভাবেই বর্ণনা করছিলেন প্রসন্নকুমারের স্ত্রী রেখা ভৌমিক। কুমিল্লার বাদুড়তলার শিশুমঙ্গল সড়কের ‘প্রসন্ন’ বাসায় আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে রেখা ভৌমিক বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫১ বছর পরেও শহীদ অ্যাডভোকেট প্রসন্নকুমার ভৌমিক এখনো অবহেলিত। এখনো শহীদের মর্যাদাটুকুও পাননি।’

একই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রসন্নের দুই কন্যা ফাল্লুনী ও শ্রাবণীও। রেখা ভৌমিক ও তার সন্তানদের একমাত্র চাওয়া, প্রসন্নকুমারকে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

নিজের ত্যাগ ও নানা চড়াই-উতরাইয়ের বর্ণনা দিয়ে রেখা ভৌমিক বলেন, ‘আমার বিয়ের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় হানাদার বাহিনী প্রসন্নকে ধরে নিয়ে যায়। তখন দেড় বছরের ফাল্গুনী কোলে ছিল আর পেটে ছিল ছয় মাস বয়সী শ্রাবণী। প্রসন্নকে তুলে নেওয়ার পর এক কাপড়ে মেয়েকে নিয়ে বাসা তালা দিয়ে প্রতিবেশী শামসুদ্দিন সাহেবের মাধ্যমে লাকসামে বাবার বাড়ি ফিরে যাই। সেখানেও মিলিটারি হানা দিলে আমরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা ক্যাম্পে যাই। ওই ক্যাম্পে জন্ম হয় শ্রাবণীর। দেশ স্বাধীনের পর বাবার বাড়িতে ফিরে এসে কুমিল্লার বাদুড়তলা শিশুমঙ্গল সড়ক লাগোয়া এলাকায় জায়গা কিনে বাসা করি। ওই বাসার নাম দিই “প্রসন্ন”।’

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার তারাবাড়িয়া গ্রামের গুরুদাস ভৌমিক ও রামমালা ভৌমিকের একমাত্র ছেলে প্রসন্নকুমার ভৌমিক। ১৯৬৬ সালে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হয়ে আইন পেশায় আসেন। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন। একাত্তরের ৭ মার্চের পর থেকে নানা ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে (রানীরদিঘির পশ্চিম পাড়ে) শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্বাধীনতাসৌধে ১৩ নম্বরে প্রসন্নকুমারের নাম আছে। এখানে ২৮ জন শহীদের নামের তালিকা খোদাই করা আছে। কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্মিত স্মৃতিসৌধেও তার নাম আছে।

কুমিল্লার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন বিএলএফ-মুজিব বাহিনীর কমান্ডার নাজমুল হাসান পাখি বলেন, ‘একাত্তর সালের ২৮ মার্চ অ্যাডভোকেট প্রসন্নকুমারকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে নৃসংশভাবে হত্যা করে। পরে তার পরিবার শহীদ স্বীকৃতি পেতে উদ্যোগ নিয়েছে কি না, জানি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত