রাজধানীর পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জে হিমাগারে সংরক্ষণ করা প্রায় অর্ধেক আলু অবিক্রীত রয়েছে। এরমধ্যে দিন দিন কমছে আলুর দাম। বর্তমান দরে আলু বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচও উঠবে না। উপরন্তু হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে হিমাগারে রাখা আলু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে হতাশায় ডুবেছেন হিমাগারের মালিকরাও।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ৬ উপজেলায় ৩৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়। এতে সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। আর জেলায় চালু থাকা ৬৪টি হিমাগারে আলু রাখা হয়েছে সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন।
জানা গেছে, বর্তমানে ৫০ কেজি ওজনের প্রতিবস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা। প্রতি কেজি আলুর দাম দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। অথচ জমিতে রোপণ, হিমাগারের ভাড়া, বস্তা কেনা ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে কেজিপ্রতি আলুতে খরচ হয়েছে ১৮ টাকা থেকে ২০ টাকা। এ খরচ তুলে কিছু লাভের আশায় দীর্ঘদিন ধরেই হিমাগারে আলু রেখেছেন কৃষকরা। কিন্তু দিন দিন কমছে আলুর দাম। এতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
জেলা সদরের চরাঞ্চল মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মাকহাটি গ্রামের কৃষক গিয়াসউদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘গত বছর ১ হাজার ৪০০ বস্তা আলু হিমাগারে রাইখা ৯ লাখ টাকা লোকসান হইছিল। এবার ৮০০ বস্তা রাখছি। উৎপাদন ও হিমাগারে রাখার খরচ মিলে বস্তাপ্রতি আলুর দাম পড়ছে ৯৫০ টাকা। কিন্তু এখন এক বস্তা আলু বিক্রি হইতাছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। মনে হয় আর আলু চাষ করতে পারমু না। আমরা আর আলু লাগামু না।’
সদর উপজেলার মহেশপুর গ্রামের কৃষক বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘সব জিনিসের দাম বাড়ছে। ৫ টাকার চা এখন ১০ টাকা হইছে। চিনি ১২০ টাকা কেজি। অথচ আলুর দাম দিন দিন কমছে। আবার সারের দামও বাড়াইছে। আমরা আর আলু খেতি করমু না, এই কানে ধরলাম।’
জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার তস্তিপুর গ্রামের কম্বাইন্ড ফুড অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজের সহকারী ম্যানেজার হৃদয় ইসলাম জানান, তাদের হিমাগারে ১ লাখ ২০ হাজার বস্তা আলু রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ হাজার বস্তা আলু বিক্রি হলেও বাকি অর্ধেকের বেশি আলু অবিক্রীত রয়েছে। তিনি বলেন, সংরক্ষণের জন্য বস্তাপ্রতি ভাড়া নিচ্ছি ২২০ টাকা। বর্তমানে আলুর দাম কম। তাই আলু বিক্রি করতে কৃষক হিমাগারে আসছে না।
একই উপজেলার বালিগাঁও গ্রামের ইউনুস কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার সফিউল আলম বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বর আলু সংরক্ষণের সময় শেষ হয়ে যাবে। এর আগেই হিমাগারের ভাড়া পরিশোধ করে আলু বের করতে হবে। কিন্তু এখনো অর্ধেক আলু রয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এবার সংরক্ষণ করা সব আলু বিক্রি হবে না।
সিরাজদীখান উপজেলার সম্রাট কোল্ড স্টোরেজে ১ লাখ ৯০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়। এ পর্যন্ত ৬১ হাজার বস্তা আলু বিক্রি হয়েছে। এ হিমাগারের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম খান বলেন, হিমাগার বন্ধ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি আছে। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে বাকি আলু বিক্রির কোনো সম্ভাবনা নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. খুরশিদ আলম বলেন, বাংলাদেশে আলুর চাহিদা ৮০ লাখ মেট্রিক টন। অথচ উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। বিদেশে আলু রপ্তানি করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় আলু উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে দাম কমে যাচ্ছে। তাই আমরা কৃষকদের অন্যান্য ফসল উৎপাদনের পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু এই জেলার কৃষকরা বারবার আলু চাষ করে, আর লোকসান দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, মুন্সীগঞ্জের অধিকাংশ হিমাগারে রাখা আলু অবিক্রীত রয়েছে। বাজারে আলুর দাম কমেছে। অন্যান্য শাকসবজির তুলনায় আলুর দাম কম। তাই কৃষক হিমাগার থেকে আলু নিতে আসছে না। কেননা ভাড়ায় পোষাবে না। একই সঙ্গে বেপারীরাও আলু কিনতে আসছে না।
