তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাঠানোর মূল হোতা উল্কা গেমস লিমিটেডের সিইও জামিলুর রশিদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
রবিবার (৩০ অক্টোবর) রাতে র্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৪ এর অভিযানে রাজধানীর মহাখালী ও উত্তরা এলাকা হতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেন- সায়মন হোসেন (২৯), মো. রিদোয়ান আহমেদ (২৯), মো. রাকিবুল আলম (২৯), মো. মুনতাকিম আহমেদ (৩৭) ও কায়েস উদ্দিন আহম্মেদ (৩২)।
এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, সিপিইউ, সার্ভার স্টেশন, হার্ড ডিস্ক, স্ক্যানার, ডিভিডি ড্রাইভ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ডেভিড ও ক্রেডিট কার্ড এবং পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও নগদ টাকাসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।
আজ সোমবার (৩১ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে।
র্যাব জানায়, উল্কা গেমসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও গ্রেপ্তারকৃত জামিলুর রশিদ। ২০১৭ সালে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি প্রতিষ্ঠান মুনফ্রগ ল্যাবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সে মুনফ্রগ ল্যাব এর বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেড় লক্ষাধিক টাকা বেতনে নিযুক্ত হয়। মুনফ্রগ ল্যাবের অনলাইন জুয়া অ্যাপ ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় গেমটিকে আরও ছড়িয়ে দিতে দেশে বৈধতা প্রদানের জন্য কতিপয় আইনজীবীর পরামর্শে সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে জামিরুল রশিদ ‘উল্কা গেমস প্রাঃ লিঃ’ নামে একটি গেমিং ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেয়। ২০১৯ সালে মুনফ্রগের ০.০১ শতাংশ উল্কা গেমসকে প্রদানের মাধ্যমে দেশে গেমিং খাতে উন্নয়নের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা প্রদানের মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ হয়। দেশে গেম ডেভেলপমেন্টের অনুমোদন থাকলেও অনলাইন জুয়া/ক্যাসিনোর অনুমোদন না থাকায় উল্কা গেমস বিভিন্ন ভুল তথ্য উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতে আইনি বৈধতা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে। এভাবেই ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ যাত্রা শুরু করে শহর নগরে ছড়িয়ে পরে। উল্কা গেমস এর যাত্রা গেমিং ডেভেলপমেন্টের উদ্দেশ্যে শুরু হলেও তারা বস্তুত গেম ডেভেলপমেন্ট না করে তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে অর্থ দেশের বাইরে প্রেরণের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
‘তিন পাত্তি গোল্ড’ মূলত একটি অ্যাপ যা মোবাইলে ডাউনলোড করে খেলা যায়। এই অ্যাপের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ মুনফ্রগ ল্যাব এর নিকট রয়েছে। এই অ্যাপে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ ছাড়াও রাখি, আন্দর বাহার ও পোকার নামেও অনলাইন জুয়ার গেমস রয়েছে। যে কোন কাজের পাশাপাশি এই গেম খেলতে পারা যাওয়ায় তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিকট এটি জনপ্রিয়তা পায়। গেমস এর রেজিস্ট্রেশনের পর একজন গ্রাহককে গেমস খেলার জন্য কিছু চিপস ফ্রি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গেমস খেলার জন্য অর্থের বিনিময়ে চিপস ক্রয় করতে হয়। মূলত মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে গ্রাহকদের নিকট হতে চিপস ক্রয়ের অর্থের লেনদেন হয়। জানা যায় যে, প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার কোটি চিপস বিক্রি হয় এবং প্রতি কোটি চিপস বিভিন্ন পর্যায়ে ৪৬-৬৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন বট প্লেয়ার/রোবট প্লেয়ার এর মাধ্যমে মূল গেইমারদের কৌশলে হারিয়ে প্লেয়ারদের পরবর্তীতে আরও চিপস কিনতে উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এর চিপস বিক্রয়ের কাজটি ১৪টি অফিশিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর/এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এই সকল ডিস্ট্রিবিউটরদের সাব ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া, প্রাইভেট টেবিল অপশনের মাধ্যমে অন্য প্লেয়ার হতেও চিপস ক্রয় করা যায়। বর্তমানে ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এ প্রায় ৯ লক্ষ নিয়মিত গেইমার রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার চিপস বিক্রি হয় বলে জানা যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, ভার্চুয়াল চিপস অর্থের বিনিময়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মূলত বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চিপস বিক্রয়ের টাকা ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে উল্কা গেমস এর ৪টি অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটির অধিক টাকা রয়েছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া গত দুই বছর তারা মুনফ্রগ ল্যাব’কে ব্যাংকের মাধ্যমে ২৯ কোটি টাকা প্রদান করেছে। উল্কা গেমস এর মোট ৩৬ জন কর্মকর্তা/কর্মচারী ছিল। বেতন প্রদানসহ অফিস পরিচালনায় প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হতো। এ ছাড়া, কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বাৎসরিক বেতনের ৩০-৯০% হারে বোনাস প্রদান করা হতো। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশের বাইরে অনলাইন জুয়ার অর্থ প্রেরণ করত।
গ্রেপ্তারকৃত জামিলুর রশিদ ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে প্রাচ্যের একটি দেশ হতে ২০১২ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসে। ছোটকাল থেকেই মোবাইল গেইমস এর প্রতি আসক্ত হওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে মোবাইল গেমস তৈরির কাজ শুরু করে। হিরোজ অফ ৭১ ও মুক্তি ক্যাম্প নামক ২০১৭ সালে দুইটি গেমস নির্মাণের জন্য সে সরকারের নিকট হতে ৩০ লাখ টাকা অনুদান পায়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মুনফ্রগ ল্যাব এর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত হয়। ২০১৮ সালে সে গেমস ডিজাইন কনসালট্যান্ট ও বাংলাদেশে নিযুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে মুনফ্রগ হতে দেড় লক্ষাধিক টাকা বেতনে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে, ২০১৯ সালে উল্কা গেমস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সিইও হিসেবে নিযুক্ত হয়ে সে মুনফ্রগ হতে মাসিক প্রায় ৪ লাখ টাকা বেতন পেত। এ ছাড়া, সে বাৎসরিক আয়ের ৯০-১০০% বোনাস পেত বলে জানা যায়। তার বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে বেশ কিছু টাকা, একটি দামি গাড়ি এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ফ্ল্যাট ও জমি রয়েছে বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তারকৃত রিদোয়ান আহমেদ ঢাকার একটি কলেজ হতে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে। ২০১৬ সালে পোর্ট বিøস লিঃ নামের একটি গেমিং প্রতিষ্ঠানের অ্যাডমিন অফিসার হিসেবে কর্মকালীন জামিলুর রশিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। ২০১৯ সালে ৪০ হাজার টাকা বেতনে সে উল্কা গেমস এ যোগ দেয় এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ক্রয়-বিক্রয়, ভেন্ডর ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট আয়োজনসহ অফিস পরিচালনার দায়িত্ব পালন করত। বর্তমানে তার বেতন ১ লক্ষাধিক টাকা ছিল। তার বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রচুর পরি মান অর্থ জমা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু বিনিয়োগ ও সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তারকৃত কায়েস উদ্দিন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে মার্কেটিং বিষয়ে বিবিএ সম্পন্ন করে। বিভিন্ন প্রাইভেট ও এমএনসিতে চাকরি করত। ২০২১ সালে সে উল্কা গেমস লিঃ এ হেড অফ সেলস হিসেবে যোগদান করে। তার নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় ডিস্ট্রিবিউটরের ভার্চুয়াল চিপস বিক্রয়, টার্গেট অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করত। সে মাসিক ২ লক্ষাধিক টাকা বেতন পেত বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তারকৃত সায়মন হোসেন ঢাকার একটি কলেজ হতে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে ২০২০ সালে উল্কা গেমসে ৪০ হাজার টাকা বেতন চাকরি শুরু করে। সে উল্কা গেমস এ প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা ছিল। বর্তমানে তার বেতন ছিল প্রায় ১ লাখ টাকা। সে উল্কা গেমস এর যাবতীয় হিসাবের দায়িত্ব পালন করে। এ ছাড়া সে মুনফ্রগ লিঃ এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের দায়িত্ব পালন করে থাকে।
গ্রেপ্তারকৃত রাকিবুল আলম একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিবিএ সম্পন্ন করে। সে ২০১৯ সাল হতে উল্কা গেমস এ ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ এ চিপস বিক্রয়ের ডিস্ট্রিবিউটরের কাজ শুরু করে। সে মাঠ পর্যায়ে ‘কে এন্ড কে এন্টারপ্রাইজ’ এর নামে গ্রাহকের নিকট ভার্চুয়াল চিপস বিক্রয় করত। সে প্রতি মাসে প্রায় ২-৩ কোটি টাকার ভার্চুয়াল চিপস বিক্রয় করত বলে জানা যায়। বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার প্রচুর পরিমাণে অর্থ রয়েছে বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তারকৃত মুনতাকিম আহমেদ বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে প্রাচ্যের একটি দেশ হতে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে। দেশে ফিরে সে বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। পরবর্তীতে ২০১৬ সাল হতে ট্যাক্স ও ভ্যাট এর কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০১৯ সালে উল্কা গেমস লিঃ এর পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হয় এবং বিভিন্ন কৌশলে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ভার্চুয়াল চিপস বিক্রয়ের অর্থ দেশের বাইরে প্রেরণের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিল। উল্কা গেমস লিঃ হতে তাকে মাসিক দেড় লক্ষাধিক টাকা প্রদান করা হতো বলে জানা যায়।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
