কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী। বর্তমান সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ ও ২০১৭ সালে বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজা ই এলাহির এসব সমর্থকদের মধ্যে আছেন বয়স উত্তীর্ণ, অছাত্র ও নানা অপকর্মে অভিযুক্তরা। এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির সক্রিয় ও উদীয়মান নেতাকর্মীরা।
গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে ইলিয়াস সমর্থিত পদপ্রত্যাশীরা তাদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন এবং উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক ফাহিম ইসলাম লিমনের কাছে। অন্য দিকে রেজা ই এলাহি সমর্থিত পদপ্রত্যাশীরা তাদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়ে। রেজা ই এলাহির ভাষ্য, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্দেশনা অনুযায়ী এ কাজ করেন তার সমর্থকরা।
ইলিয়াস সমর্থিত গ্রুপে সিভি জমা দিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইমরান হোসাইন ও বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পলাশ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাদাৎ মো. সায়েম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান রকি, দত্ত হল ছাত্রলীগের সভাপতি রাফিউল আলম দীপ্তসহ অন্তত ৩০ জন। এছাড়া শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মেহেদী হাসান বিদ্যুৎও শীর্ষ পদে আসার জন্য দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে ইমরান হোসাইন, মেহেদী হাসান বিদ্যুৎ ও রকিবুল হাসান রকির ছাত্রত্ব নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যুৎ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সনদ অনুযায়ী তার বয়স ৩১ বছর। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনি এখন সদস্যও নন। এছাড়াও দুই বছর আগে এক ছাত্রীকে হেনস্তা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইমরান হোসাইন বাংলা বিভাগের স্নাতক ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তারও ছাত্রত্ব নেই। রকি মার্কেটিং বিভাগের স্নাতক ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী। তারও স্নাতকোত্তরের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে রেজা সমর্থিত গ্রুপের রেজা ই এলাহি, শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্বজন বরণ বিশ্বাস, ফিন্যান্স ৯ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইকবাল হোসাইন খান, গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মোবারক হোসেন মাহী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের যুগ্ম সম্পাদক মুমিন শুভসহ জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন অন্তত ২০ জন। তাদের মধ্যে রেজা ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হয়ে ২০১৬ সালে স্নাতক পাস করে বেরিয়ে যান। শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ অনুযায়ী তার বয়স বর্তমানে ৩০। তার বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ৮ মার্চ বরুড়ার তালুকপাড়া গ্রামের এক নারীকে ধর্ষণ চেষ্টা, ভাঙচুর, জালিয়াতি ও লুটতরাজের একটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। তিনি মার্কেটিং বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও কাজী নজরুল ইসলাম হলের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ হত্যারও এজাহারভুক্ত আসামি। স্বজন নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনিও খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যার ২ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি। এই মামলায় ৫৫ দিন জেলও খেটেছেন তিনি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদকসেবন ও চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারও করা হয়।
ইকবাল ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের স্নাতক ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি শাখা ছাত্রলীগের কোনো পর্যায়ের কর্মী বা সমর্থক ছিলেন না এবং কোনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সংযুক্ত ছিলেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের মোটরবাইক শোডাউন ও বঙ্গবন্ধু হলে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। মমিন শুভর ছাত্রত্ব থাকলেও তাকে সংগঠনের নীতি-আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে অব্যাহতি দেয় শাখা ছাত্রলীগ।
ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অনূর্ধ্ব-২৯ বয়সী বাংলাদেশের যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা ছাত্রী ছাত্রলীগের প্রাথমিক সদস্য হতে পারেন। তবে সদস্যপদ ঠিক রাখার মূল শর্ত হলো শিক্ষাজীবন অব্যাহত থাকা। কিন্তু কুবি ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে অনেকেরই ছাত্রত্ব নেই এবং বয়স উত্তীর্ণ।
যদিও রেজা ই এলাহি দাবি করেছেন তার ছাত্রত্ব আছে। তিনি এখনো ম্যানেজমেন্ট বিভাগের স্টুডেন্ট। তার এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগ করা হয় ওই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেখ মকছেদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, বিভাগের সান্ধ্যকালীন একটা কোর্সে রেজা ভর্তি আছেন।
সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন, অছাত্র, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও ফৌজদারি মামলার আসামি কাউকে যেন কমিটিতে আনা না হয় সে ব্যাপারে আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বলেছি এবং সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কাছেও আমরা বিষয়টি পেশ করেছি। বাকিটা ওনারা বিবেচনা করে দেখবেন।
কুবি শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত নিতে আসা বাং ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, কমিটি কবে হবে এটা আমি বলতে পারব না, এটা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক যাচাই-বাছাই করে দেখবেন। তারাও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কাউকে নেতা বানাবেন না। সাদ্দাম হোসেন বলেন, ছাত্রলীগ ছাত্রদের সংগঠন। তাই এ সংগঠনে অছাত্র, মাদকাসক্তকে নেতৃত্বে আনার সুযোগ নেই। এটা আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন।
