২০২১ সালের ৮ জুলাই সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া বস্তিতে (চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র) খুন হন আব্দুল মান্নানের ছেলে সামসু বাবুর্চি। বস্তিবাসীর অভিযোগ, সামসু হত্যার পেছনে মূল পরিকল্পনায় ছিলেন কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস মো. বজলুর রহমান। বজলুর ভাই মিজু, ভাতিজি জামাই শাওন ও দারোয়ান বাবু মিলে হত্যা করে সামসুকে।
হত্যাকাণ্ডের পর সামসুর মা মনি বেগম প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, বজলু মেম্বার তার ছেলেকে হত্যা করিয়েছে। কিন্তু পরে হত্যা মামলা হয় বজলুর ওই সময়কার বিরোধী পক্ষ সিটি শাহীন, রাজাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। এলাকা ছাড়ে বজলুর বিরোধী পক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, সামসু হত্যা মামলার আসামি ঠিক করে দেন বজলু। এরপর সামসুর মা ও স্ত্রীকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ঘর করে দেন তিনি। কিছুদিন খাবারেরও ব্যবস্থা করে দেন তাদের।
২০২২ সালের ১৮ জুন খুন হন সজল মিয়া। বস্তির বাসিন্দারা জানান, সজলের হত্যাকারী বজলু মেম্বারের চেলাপেলা। তবে মামলা হয় বজলুর বিরোধী পক্ষ জয়নাল ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে।
রূপগঞ্জ থানা পুলিশ সূত্র বলছে, ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে চনপাড়া বস্তি (চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বস্তি ও এর আশপাশে অন্তত ২৮টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
গত সোমবার দিনভর বস্তির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামসু ও সজল হত্যাকাণ্ডের মতো এসব খুনের ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের কথায় পুলিশ মামলা নিয়েছে। যেখানে প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে বিরোধী পক্ষের লোকজনকে আসামি করা হয়।
তারা জানান, বেশিরভাগ হত্যাকান্ডের নেপথ্যে রয়েছে বস্তিতে মাদক কারবারের আধিপত্য টিকিয়ে রাখা। যারা এসব ঘটনায় জড়িত তাদের অনেকেরই রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পদ-পদবি।
অভিযোগ রয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই পরিকল্পিত। অনেক হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে পেছন থেকে যারা কলকাঠি নেড়েছেন বা হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন তারাই ঠিক করে দিয়েছেন কে বা কারা হবে মামলার আসামি। আবার কখনো একটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রকৃত আসামির সঙ্গে নির্দোষ অনেকের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। এক পক্ষ তার বিরোধী পক্ষকে আসামি করে এলাকাছাড়া করেছে।
১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদীভাঙা, ঘরভাঙা মানুষদের শীতলক্ষ্যা নদীঘেঁষা ওয়াসার ১২৬ একর জমিতে ঠাঁই দেন। পরে সেটি ধীরে ধীরে চনপাড়া বস্তি নামে পরিচিতি পায়। ১২ হাত বাই ১৫ হাতের কয়েক হাজার ঝুপড়ি ঘরে প্রায় সোয়া লাখ লোকের বাস এই বস্তিতে। ১৯৭৬ সালে বাদশা মিয়া হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চনপাড়া বস্তিতে শুরু হয় খুনোখুনি।
এছাড়া বস্তির আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ১৯৭৯ সালে হাফেজ আলী হত্যাকাণ্ড, ১৯৮২ সালে পারভেজ মিয়া, ১৯৯৪ সালে খুন হন চাঁন মিয়া, ২০০৩ সালে ফিরোজ সরকার, ২০০৪ সালে ফারুক মিয়া, ২০০৫ সালে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হানিফ মিয়া ও ক্রিকেটার ফালান মিয়া হত্যার ঘটনা ঘটে।
২০০৮ সালে আব্দুর রহমান, ২০১১ সালে র্যাবের সোর্স খোরশেদ মিয়া, ২০১৬ সালে প্রজন্মলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনির হোসেন, ২০১৭ সালে আসলাম হোসেন নামে এক স্কুলছাত্র ও রূপগঞ্জ থানা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক হাসান মুহুরি, ২০১৯ সালে হাসান মুহুরির স্ত্রী ও ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্য বিউটি আক্তার কুট্টি, ২০২০ সালে আনোয়ার মাঝি খুন হন। ২০২১ সালে সামসু বাবর্চি ও সর্বশেষ ২০২২ সালের ১৮ জুন হত্যার শিকার হন সজল মিয়া। এদের মধ্যে পুলিশ সদস্য হানিফ মিয়া ছাড়া কোনো হত্যা মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। অনেক মামলা আদালতে বিচারাধীন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিউটি আক্তার কুট্টি বস্তিতে একক আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন। সে সময় তার বিরোধীপক্ষ ১৮ মাস বস্তিছাড়া ছিল। ঘটনার দিন ভোরে কুট্টি তার এক সহযোগীকে নিয়ে শরীরচর্চার জন্য বের হয়ে খুন হন। এরপর তার বিরোধীপক্ষ বস্তিতে ফেরে। কিন্তু কুট্টি হত্যায় কারা জড়িত সেটা আজও উদঘাটন হয়নি। হত্যার পর কুট্টির মেয়ে পারভিনকে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী ইউপি সদস্য করা হলে মামলা আর গতি পায়নি। হত্যার শিকার আসলাম হোসেনের বাবা প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুক হওয়ায় এ ঘটনায় কোনো মামলাই হয়নি।
এছাড়া অনেক মামলা গোপনে মীমাংসা হয়েছে। মামলার বাদী আর আদালতে যান না। ফলে অভিযোগ খারিজ হয়ে যায় কিংবা মামলা ঝুলে থাকে। এর কারণ হিসেবে বস্তিবাসী বলেছেন, হত্যার শিকার অনেকে খুবই দরিদ্র পরিবারের সদস্য, মামলা চালানোর মতো অবস্থা তাদের থাকে না। অনেকে আবার ভয়েও মীমাংসা করে ফেলে।
বস্তির বয়োবৃদ্ধরা বলছেন, কয়েকটি মামলার আসামিদের সাজা হলেও পরে আইনের ফাঁকফোকর গলে বের হয়ে এসেছে। তারা মনে করেন, যদি হত্যাকাণ্ডগুলোর সুষ্ঠু বিচার হতো, তাহলে বস্তির খুনখারাবি অনেকটাই কমে যেত।
নিহতদের স্বজনরাও জানিয়েছেন, অনেক মামলা পুলিশের দুর্বল এজাহারের কারণে, সাক্ষীর অভাবে কিংবা রাজনৈতিক চাপের কারণে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বস্তিতে এভাবে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, কোনো স্ত্রী যেন স্বামী না হারায় আর কোনো সন্তান যেন বাবার স্নেহবঞ্চিত না হয় এটাই তাদের চাওয়া।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশকে (২৩) চনপাড়া বস্তিতে নিয়ে হত্যা করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন তথ্যের পর ফের আলোচনায় আসে বস্তিটি। কারা এর নিয়ন্ত্রণে আর কীভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলছে মাদকের ওই সাম্রাজ্য এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এফ এম সায়েদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চনপাড়া ভয়ংকর এটা সঠিক। তবে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এখানে বসবাস করে। অনেকে আছে ভাসমান। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’
তিনি বলেন, বেশির ভাগ খুনের ঘটনাই আগের। চনপাড়ায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।
