আকসাম বিন সাইফি বনু তামিম গোত্রের সর্দার ছিলেন। অভিজ্ঞতা, জ্ঞান গরিমা আর দূরদর্শিতায় তার জুড়ি ছিল না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়তের ঘোষণা দিয়েছেন জানতে পেরে তিনি তার খেদমতে হাজির হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। গোত্রের লোকরা এ কথা শুনে পরামর্শ দিল যে, আপনি বড় সম্মানিত মানুষ। এ মুহূর্তে সেখানে সশরীরে হাজির হওয়া আপনার জন্য ঠিক হবে না। পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হলোগোত্রের কিছু লোক প্রথমে নবী করিম (সা.)-এর কাছে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসবে তারপর তাদের সর্দার যাবেন।
এই মিশন সফল করার জন্য দুই ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করে পাঠানো হলো। তারা নবীজি (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিতে লাগল। নবীজি (সা.)-এর পরিচয় এবং তার মিশন-ভিশন সম্পর্কে জানতে চাইল। তারা জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? আপনার পদমর্যাদা কী? প্রথম প্রশ্নের উত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, আমি আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা ও তার রাসুল। পরে তাদের একটি আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি লজ্জাহীনতা, অসংগত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।’ সুরা নাহল : ৯০
এই আয়াত শুনে প্রতিনিধিরা মোহিত হয়ে গেল। তারা আবার আয়াতটি শোনতে চাইলে নবীজি (সা.) বারবার আয়াতটি তেলাওয়াত করতে থাকেন; আর তারা শুনে মুখস্থ করে ফেলে। ফিরে এসে তারা গোত্রপতি আকসাম বিন সাইফির কাছে রিপোর্ট পেশ করল। তারা বলল, আমরা নবীজির (সা.) বংশ এবং গোত্রের খবর নিয়ে জানতে পারি তিনি একজন সম্ভ্রান্ত উচ্চ বংশের মানুষ। আর তিনি মানুষকে যে শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন তার বিবরণ দিতে এই আয়াত পড়ে শুনিয়েছেন। আয়াতটি শুনে আকসাম বিন সাইফি গোত্রের লোকদের সামনে মন্তব্য করল, আমার বিশ্বাস এই নবী মানুষদের উত্তম চরিত্র অর্জন এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার দীক্ষা প্রদান করেন। কাজেই তোমরা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হও, পেছনে পড়ে থেকো না। ইবনে কাসির : ৭৫১
এ ঘটনায় উল্লিখিত আয়াতটি পবিত্র কোরআনের একটি সর্বজনীন উপদেশ-সংবলিত আয়াত। যেখানে সংক্ষেপে ইসলামের সব বিধিবিধান এবং ন্যায়-অন্যায়ের আলোচনা করা হয়েছে। হজরত উসমান বিন মাজউন (রা.) বলেন, আমি প্রথমে চক্ষুলজ্জায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলোতখন ইসলামের সত্যতা হৃদয়ে গেঁথে গেল। তাফসিরে কুরতুবি : ১০/১৫
প্রসিদ্ধ তাফসিরকার আল্লামা মুহায়ামি (রহ.) বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, আল্লাহ প্রথমত এখানে তিনটি বিষয়ে আদেশ করেছেনক. আদল তথা মধ্যমপন্থা অবলম্বন, খ. ইহসান তথা একনিষ্ঠ ইবাদত ও গ. স্বজনদের মধ্যে দান, যা উত্তম চরিত্রের সোপান। এরপর এই তিনটি অর্জনীয় গুণের বিপরীত তিনটি বর্জনীয় স্বভাবের আলোচনা নিয়ে এসেছেন, যাতে মানুষ এসব নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে নিজেকে পবিত্র করতে পারেন। ক. বেহায়াপনা, যা মধ্যমপন্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ কাম-রিপুর বাসনা পুরা করতে গিয়ে চরমপন্থা অবলম্বন করাই বেহায়াপনা এবং লজ্জাহীনতা। খ. পাপকর্ম, যা নেক আমলের বিপরীত। কারণ নেক আমল দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় এবং মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়, পক্ষান্তরে পাপের কারণে আল্লাহর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় এবং লোকসমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। গ. খোদাদ্রোহী, যা উত্তম চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর মধ্যে সর্বপ্রকার জুলুম-নির্যাতন, আত্মসাৎ এবং জবরদস্তি অন্তর্ভুক্ত। তাফসিরে মুহায়েমি : ১/৪১৭
ইমাম রাজি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহ মানুষের মধ্যে এমন তিনটি শক্তি নিহিত রেখেছেন, যা নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। ক. চতুষ্পদ প্রাণীদের মতো লাগামহীন কামরিপুর শক্তি। খ. শিকারি প্রাণীদের মতো হিংস্রতা, যারা সর্বদা অন্য প্রাণীকে শিকার করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। গ. শয়তানের মতো অবাধ্যতার শক্তি, যা মানুষকে অহমিকা আর পাপকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
উল্লিখিত তিনটি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখার প্রতি এই আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কামরিপু নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘বেহায়াপনা’ থেকে বারণ করা হয়েছে। যাতে মানুষ শরিয়তবিরোধী সব ধরনের কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। হিংস্রতা নিবারণের জন্য যাবতীয় ‘পাপকর্ম’ পরিত্যাগের আদেশ করা হয়েছে। যাতে মানুষ এমন সব আচার ব্যবহার থেকে বেঁচে থাকে যা অন্যের জন্য পীড়াদায়ক। আর শয়তানি মনোভাব পরিহারের জন্য ‘খোদাদ্রোহী’ থেকে বাঁচতে বলা হয়েছে। যাতে মানুষ অন্যায়-অত্যাচার এবং জুলুম-নির্যাতন থেকে দূরে থাকে। তাফসিরে রাজি : ১০/১০৭
বর্ণিত আয়াত থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয়, মানুষ তার মধ্যে গচ্ছিত আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা আর প্রতিভার অপব্যবহার যেন না করে, এটাই আল্লাহ কামনা করেন। মানবজাতির সফলতার জন্য আল্লাহ যে বিধিবিধান দিয়েছেন তার সীমা যাতে কিছুতেই লঙ্ঘিত না হয়, এটাই ইসলামের শিক্ষা। মানবজাতির কল্যাণ-অকল্যাণের যত দিক হতে পারে সবগুলো সংক্ষিপ্তাকারে আলোচিত হয়েছে এর মধ্যে।
তাই হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) তার খেলাফতকালে সারা দেশে ফরমান পাঠিয়েছিলেন, যাতে এই আয়াতটি জুমার খুতবায় পাঠ করা হয়। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন হয়ে আসছে। পুরো বিশ্বের মুসলমানরা জুমার খুতবায় এই আয়াতটি শোনার সুযোগ লাভ করেন, যা মূলত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সর্বজনীন উপদেশ। এই উপদেশের আয়নায় নিজের জীবনকে পরখ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। এই আয়াতের মর্ম অনুধাবন করে আত্মসচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। আয়াতে বর্ণিত নির্দেশনা মতে ব্যক্তিজীবন কতটুকু প্রস্তুত হয়েছে, সে হিসাব মেলানো জরুরি।
