টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী। শুরুতে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চাপ দেয় অভিযুক্তরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশও একই পরামর্শ দেয় মেয়েটির পরিবারকে। সালিশের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মামলা না করার শর্তও আদায় করে নেওয়া হয় তার পরিবারের কাছ থেকে। তবে হাল ছাড়েননি মেয়েটির মা। তার ছোটাছুটিতে ১৩ দিন পর মামলা নিয়েছে পুলিশ। তবে ২১ দিনেও হয়নি তার মেডিকেল টেস্ট। দুই দফায় তাকে ফেরানো হয়েছে হাসপাতাল থেকে। স্বজনরা বলছেন, আলামত নষ্ট করার অপকৌশল হিসেবেই বিলম্বিত করা হচ্ছে মেডিকেল টেস্ট।
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর পরিবার জানায়, চলতি মাসের ২ তারিখে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায় ছাতিহাটি চকপাড়া গ্রামের লিয়াকত আলীর ছেলে হাসিব (২৫) ও আয়নালের ছেলে রিপনসহ অজ্ঞাত আরও তিনজন। অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে অন্যদের সহযোগিতায় হাসিব তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। পরে রাত ৩টার দিকে তারা মেয়েটিকে বাড়ির পাশে রেখে যায়। তখন মেয়ের মা-বাবা এগিয়ে গেলে বিষয়টি কাউকে না জানাতে বলে অভিযুক্তরা। জানালে দেয় হত্যার হুমকিও।
ওই স্কুলছাত্রীর মা বলেন, ‘ঘটনার পরদিন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন, ইউপি সদস্য বাবু খান ও মহিলা ইউপি সদস্য মলিনা বেগমকে জানাই। পরে কালিহাতী থানায় ছাতিহাটি চকপাড়া গ্রামের লিয়াকত আলীর ছেলে হাসিব, আয়নালের ছেলে রিপন, মুনায়েম হোসেনের ছেলে আয়নাল ও নুরু মিয়ার ছেলে ফারুকসহ অজ্ঞাত আরও তিনজনকে আসামি করে লিখিত অভিযোগ দিই। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কালিহাতী থানার এসআই আলামিন এলাকায় তদন্তে এসে আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো হুমকি দিয়ে বলেন, চেয়ারম্যান মেম্বারদের নিয়ে আপস করে ফেলেন। পরে চেয়ারম্যান আমাকে মহিলা ইউপি সদস্য মলিনা বেগমের বাড়িতে ডেকে নিয়ে ছেলেপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আপসনামায় জোরপূর্বক আমার স্বাক্ষর নেন। এ বিষয়ে ওসিকে জানালে তিনি মামলা নিতে গড়িমসি করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে বিভিন্ন মহলের চাপে ঘটনার ১৩ দিন পর মামলা গ্রহণ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আলামিনকে পরিবর্তন করে এসআই কামরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেদিন আমার মেয়েকে মেডিকেল করানোর জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে মেয়ে অসুস্থ বলে পুলিশ সাত দিন পর মেডিকেল করার জন্য আসতে বলে। সবশেষ গতকাল বুধবারও একই কথা বলে তার মেডিকেল টেস্ট করা হয়নি। এটা আলাতম নষ্টের পাঁয়তারা। আমরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আসামিদের লোকজন মামলা তুলে নিতে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্নভাবে হুমকিধমকি দিয়ে চলছে।’
তিনি জানান, গত রবিবার তিনি টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে বিষয়টি জানান। সে সময় তিনি কালিহাতী থানার ওসিকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এদিকে ধর্ষণের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিষয়টি পাইকড়া ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন স্বীকার করে বলেন, ‘জরিমানার টাকা ১০ তারিখে দেওয়ার কথা থাকলেও জানতে পারি তারা থানায় মামলা করেছেন। এ জন্য টাকাগুলো আর দেওয়া হয়নি। ধর্ষণের অভিযোগ এলাকায় জরিমানা করে মীমাংসা করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নটি তিনি জবাব না দিয়ে এড়িয়ে যান।
তবে কালিহাতী থানার এসআই আলামিন আপস-মীমাংসার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘এটা আপসযোগ্য নয়। আপস করার কারও এখতিয়ার নেই।’ থানার ওসি মোল্লা আজিজুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে ওই স্কুলছাত্রীর পরিবার থানায় হুমকির অভিযোগ করে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে এলাকায় পুলিশ পাঠাই। পরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ তোলে। আমরা বিষয়টি আমলে নিয়ে মামলা নিই। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শুনেছি ওই ছাত্রীর শারীরিক সমস্যার কারণে মেডিকেল হয়নি। এতে পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই।’
