মানবিক সংকটের মুখে আফগানিস্তান

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১০:৩৯ পিএম

পশ্চিমা বাহিনী ও তাদের অনুগতদের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের পর গত বছর আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসে তালেবান গোষ্ঠী। বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে কমে আসে সহায়তা। বিশেষ করে পশ্চিমা সাহায্য। এতে ভুগছে সাধারণ আফগানরা। অভাবের প্রথম শিকার হচ্ছে শিশুরা। একদিকে খাদ্যাভাব, অন্যদিকে ধর্মীয় কট্টরপন্থায় শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার, কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত নারীরা। সব মিলিয়ে এক মানবিক সংকটে আফগানিস্তান। 

খাদ্যাভাব এতই প্রকট যে আফগানরা শিশুদের ক্ষুধার জ্বালা ভুলিয়ে রাখতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে রাখছে। লাখ লাখ আফগান দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। এই পরিস্থিতি উঠে এসেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে। আবদুল ওয়াহাব নামে এক আফগান বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা কাঁদতেই থাকে, তারা ঘুমায় না। আমাদের কোনো খাবার নেই। তাই আমরা ফার্মেসিতে গিয়ে ট্যাবলেট নিয়ে আসি ও তাদের দিই, যাতে তারা তন্দ্রাচ্ছন্ন বোধ করে।’

আবদুল ওয়াহাব দেশটির তৃতীয় বৃহত্তর শহর হেরাতে বাস করেন। শহরটিতে রয়েছে কাদামাটির হাজারো ছোট ছোট ঘর। গত এক দশকে এই সংখ্যা বেড়েছে। যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষত বয়ে বেড়ানো লোকজনে শহরটি পূর্ণ। ওয়াহাবের কাছে বিবিসি জানতে চায়, কত সংখ্যক মানুষ ক্ষুধার্ত সন্তানদের ওষুধ দিয়ে শান্ত রাখছে। জবাবে তিনি বলেন, আমাদের অনেকেই, আমরা সবাই। গুলাম হজরত নামে এক ব্যক্তি তার পকেট থেকে কতগুলো ট্যাবলেট বের করলেন। এগুলো ছিল আলপ্রাজোলাম-ট্রানকুইলাইজার্স গোত্রীয়। এসব ট্যাবলেট সাধারণত দুশ্চিন্তাজনিত রোগের চিকিৎসায় দেওয়া হয়ে থাকে। গুলামের ছয় সন্তান। ছোটটির বয়স এক বছর, আমি তাকেও এটি (ওষুধ) দিই বলেন তিনি।

বর্তমানে আফগান পুরুষকে অধিকাংশ দিনই কাজ ছাড়া থাকতে হয়। পেলেও সর্বসাকুল্যে দৈনিক আয় ১০০ আফগানিজ বা এক ডলারের কিছু বেশি রোজগার হয়। অন্যদিকে কড়া শরিয়া আইনে নারীর শিক্ষা ও কাজে যাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বেশ কঠোরতা। বলতে গেলে নিষিদ্ধ। পরিবারের মুখে আহার তুলে দিতে নারীদের অনেককে বাধ্য হয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও বিক্রি করতে হচ্ছে। বিবিসি কম বয়সী এক আফগান মায়ের সঙ্গে কথা বলে, যিনি সাত মাস আগে কিডনি বিক্রি করেছেন। তারও ঋণ পরিশোধের তাগিদ ছিল। ঋণ করে তিনি ভেড়ার পাল কিনেছিলেন। তবে বছরখানেক আগে বন্যায় তার ভেড়াগুলো মারা যায়। এরপর থেকে তার পরিবারের আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিডনি বিক্রি করে ওই নারী পেয়েছিলেন ২ লাখ ৪০ হাজার আফগানিজ (২৭০০ ডলার)। তবে এই অর্থও পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, এখন আমাদের দুই বছরের মেয়েকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এদিকে ক্ষমতাসীন তালেবান গোষ্ঠী দেশটির নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর যেসব বিধিনিষেধ জারি করেছে, সেসব মানবতাবরোধী অপরাধের সমতুল্য বলে মনে করে জাতিসংঘ। শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট এবং বৈশ্বিক এই সংস্থাটির অন্যান্য মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ আফগানিস্তানে নারীদের পরিস্থিতি সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘তালেবানগোষ্ঠী

আফগানিস্তানের নারী ও মেয়েশিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে এবং বিভিন্ন কঠোর আইন জারির মাধ্যমে ধীরে ধীরে যেভাবে তাদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা তারা কেড়ে নিচ্ছে, তা ব্যাপকভাবে নিপীড়নমূলক। আফগান নারী ও মেয়েরা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হচ্ছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত