গ্রাহকদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:২৪ এএম

দেশে ইসলামি ধারার ব্যাংক ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থায় স্বল্পতম সময়ে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক চলছে ব্যাংকটিকে ঘিরে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির সার্বিক অবস্থা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মনিরুল মাওলা।

২০১৭ সালে মালিকানা পরিবর্তনের প্রায় পাঁচ বছর পর ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ নিয়ে বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে ব্যাংকটি নিয়ে কয়েকটি সংবাদ প্রকাশের পর ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু তথ্য ছড়িয়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে গ্রাহকদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ মনিরুল মাওলা।

মনিরুল মাওলা বলেন, একটি ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু মালিকানা পরিবর্তনের পর গত পাঁচ বছরে ইসলামী ব্যাংক সব সূচকেই উন্নতি করেছে। মালিকানা পরিবর্তনের সময় ব্যাংকটির আমানত ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। আমানত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঋণ বিতরণও বেড়েছে স্বাভাবিক নিয়মে। ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সে হিসেবে আমরা মনে করি অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক আরও এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বিশ্বে তুলে ধরছে ইসলামী ব্যাংক জানিয়ে মনিরুল মাওলা বলেন, একটি ব্যাংককে পরিমাপ করার জন্য যতগুলো সূচক আছে, অর্থাৎ ব্যাংকের আমানত, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয়, পরিচালন লাভ থেকে শুরু করে আমদানি, রপ্তানিসহ সব সূচকেই ইসলামী ব্যাংক সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। এ অবস্থায় ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে বেশ কয়েকটি সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। বাংলাদেশের গতিশীল অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য এসব সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। কারণ ব্যাংকিং খাতকে মানুষ সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। এ বিশ্বাসে যদি ফাটল ধরানো যায় তাহলে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে। এ জন্য কিছু লোক এ জায়গাটিকে বেছে নিয়েছে। দেশের এমন কোনো খাত নেই যেখানে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ নেই। এমনকি দেশের সব বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়েগের কারণে দেশে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড একসঙ্গেই চলছে। প্রতিষ্ঠার ৪০ বছরে অনেক গ্রাহক আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। ইসলামী ব্যাংকের এমডি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের আমানতকারী সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ। পারিবারিক সদস্য সংখ্যা বিবেচনা করা হলে এর সংখ্যা ৮ কোটি ছাড়াবে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে ইসলামী ব্যাংক সব প্যারামিটারেই সেরা। গ্রাহকরা গত ৪০ বছর আমাদের সঙ্গে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে এক হাজার ব্যাংকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে আমাদের অবস্থান ৮৮২তম। আর দ্রুত সময়ের মধ্যে শীর্ষ ৫০০ ব্যাংকের মধ্যে আসতে চাই।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার দুটি খাত রয়েছে। রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী আয় সংগ্রহে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ৩০ শতাংশই আসে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এ ছাড়া যে তিনটি দেশ (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র) থেকে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে, সেই দেশগুলো বিবেচনায় নিলে এ ব্যাংকের মাধ্যমেই ৫২ শতাংশ প্রবাসী আয় আসে বলেও জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের এমডি।

সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঋণ অনিয়মের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার বাইরে কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি। গণমাধ্যমে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে আংশিক সত্য রয়েছে। যেমন তারা উল্লেখ করেছে, নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। বিষয়টি সঠিক। দেশের খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা যেসব বিনিয়োগ করেছি তার অধিকাংশ এলসির দায় নভেম্বরে পরিশোধ করা হয়েছে। যে কারণে এ মাসে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বেশি ছিল। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তা খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়েও যায় তাদের অর্থ জামানত থেকে উঠে আসবে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান ঋণের টাকা পরিশোধ করবে বলেও আশা করছি আমরা।

নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণের বিষয়ে মনিরুল মাওলা বলেন, যে বিনিয়োগগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেগুলো দেশ ও জাতির কল্যাণে দেওয়া হয়েছে। করোনাকালীন দেশে আমদানি করার সুযোগ হয়নি। করোনার পর আমদানির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে খাদ্যপূর্ণ আমদানির চাহিদা বাড়ার কারণে আমরা বেশ কিছু বিনিয়োগ করেছি। প্রধানমন্ত্রী পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল, দেশের কোনো জায়গায় যাতে খাদ্যপণ্যের ঘাটতি তৈরি না হয়। এ জন্য ইসলামী ব্যাংক বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে।

তবে অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা দেশের সব জায়গায় পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় স্থানীয় পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান পাইকারি বিক্রি করে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছু বিনিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অপরিচিত এসব প্রতিষ্ঠানকেই গণমাধ্যম বেনামি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তবে আমাদের টিম ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিদর্শন করে ও তাদের ঋণ পরিশোধের সম্ভাব্যতা যাচাই করেই এসব বিনিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের টিম বর্তমানেও ওইসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। পণ্য বিক্রি হলেই আমরা তাদের ঋণ সমন্বয় করে নেব।

সম্প্রতি আলোচিত রাজশাহীকেন্দ্রিক নাবিল গ্রুপকে দেওয়া ঋণ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের এমডি বলেন, নাবিল গ্রুপ একটি বড় প্রতিষ্ঠান। আমরা ২০০২ সাল থেকে তাদের সঙ্গে ব্যবসা করছি। তাদের বর্তমান বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় বেশ কয়েকটি ফিড মিল রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় অটোরাইস মিল নাবিল গ্রুপের। এ ছাড়া তাদের কোল্ড স্টোরেজ, হ্যাচারি, পোলট্রিসহ নানা ধরনের ব্যবসা রয়েছে। এই গ্রুপের শুরুও হয়েছে ইসলামী ব্যাংকে থেকে নেওয়া ১৫ লাখ টাকা ঋণ দিয়ে। এখন এটি একটি বড় গ্রুপে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ একদিনের জন্যও খেলাপি হয়নি। এই গ্রুপটিকে দেওয়া ঋণগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে ফেরত আসবে বলেও জানান তিনি।

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে মনিরুল মাওলা বলেন, ইসলামী ব্যাংকের আমানত সর্বোচ্চ। আমাদের বর্তমানে ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ঋণের দিকে দ্বিতীয় অবস্থানে যে ব্যাংক রয়েছে, তার ঋণের পরিমাণ ৫২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানত এবং ঋণ বিতরণে ইসলামী ব্যাংক সবার শীর্ষ অবস্থান করছে। আমাদের যে ঋণ রয়েছে, তার মধ্যে খেলাপির পরিমাণ মাত্র ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ। যদিও ৫ শতাংশ খেলাপি থাকলেও তাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। তবুও আমরা এ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত সময়ের মধ্যে তিন শতাংশের নিচে নিয়ে আসতে কাজ করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত