বিদেশে খেলাপিদের সম্পদ খুঁজছে ৮ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

দেশের ব্যাংক খাতের বড় খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হচ্ছে। ঋণখেলাপিদের বিদেশে পাচার করা অর্থ-সম্পদ এবং বিদেশে অবস্থান করা ঋণগ্রহীতাদের সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। রবিবার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কিছু ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন আইনি প্রতিষ্ঠান বা লিগ্যাল ফার্মের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে দেশগুলোতে অর্থ পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেসব দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা হবে। সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হলে উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে এসব প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পাওনা খেলাপি ঋণ আদায়েও বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।

এ কার্যক্রমে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, হোয়াইট অ্যান্ড কেস এবং ডেলয়েটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হয়েছে। এসব ঋণগ্রহীতার বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আটটি বিদেশি আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা অনেক ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে দেশে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে অথবা ঋণগ্রহীতা নিজেই বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তথ্য রয়েছে। দেশে থাকা সম্পদ দিয়ে ঋণ আদায় সম্ভব না হলে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জব্দ বা আটকের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে যেসব দেশে পাচারকৃত অর্থ বা সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব দেশকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া।

বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আলোচ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও পরিমাণ শনাক্ত করছে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী সম্পদ জব্দ, স্থগিত বা আটকের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কোনো দেশে সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা জব্দ বা আটক করা সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে ওই সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।

বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়’ পদ্ধতি। ফলে ব্যাংকগুলোকে শুরুতেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে না। বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোনো সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলে তবেই চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগের ফলে বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ের সুযোগও বাড়বে। বিশেষ করে দেশে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করা ঋণখেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত করে আইনগত প্রক্রিয়ায় জব্দ বা আটকের উদ্যোগ খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন পথ তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বলছে, বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও আইনগতভাবে জব্দ করার পর তা নিষ্পত্তি করে অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে। তবে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বড় খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর অগ্রগতি আনার চেষ্টা চলছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত