কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বর্তমানে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিন দশকেরও বেশি সময় কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজি ও নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও কলকাতায় উপ-হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন উচ্চতর পদে আসীন ছিলেন। কাজ করেছেন জাতিসংঘে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে বাধা-হামলা-দমন-পীড়ন নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর-এর সহকারী সম্পাদক আহমেদ মুনীরুদ্দিন
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দমন-পীড়ন নিয়ে সরব বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা। এসব কি সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে? আপনার মূল্যায়ন কী?
এম হুমায়ুন কবির : আসলে নানা দিক থেকেই সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দুঃখজনক। বিগত কয়েকদিন ধরে দেশে যা ঘটেছে সেসব না হলেই ভালো হতো। কারণ নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। এখনই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন সাজ সাজ রব, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর উত্তেজনা ছড়ানো এবং কিছু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটতে দেখছি আমরা। কিন্তু বড় পরিসরে দেখলে বাংলাদেশের যে গল্প আমরা দেখি সেটি সব মিলিয়ে অনেক ইতিবাচক। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কাঠামোগত উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, গড় আয়ু ও আয় বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যুর হার কমা সব ক্ষেত্রেই আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। এই সবকিছুই বাংলাদেশের অগ্রগতির একটা দৃঢ় ভাবমূর্তি তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা আমাদের সহযোগী রাষ্ট্র ও শক্তিগুলো বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেছে, সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক যে পরিস্থিতি আমরা দেখছি, বিশেষ করে মানবাধিকারের প্রশ্নে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিসরে বেশ নাড়াচাড়া হয়েছে। সেটা দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সবভাবেই। এসবের সূত্র ধরে এখন রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন, মতপ্রকাশ ও সভা-সমাবেশের অধিকার এসব নিয়েও কথা উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বক্তব্য-বিবৃতি এবং তৎপরতা হয়তো সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে, আসল কথাটা হলো, আমরা নিজেরা নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে পারছি কি না।
দেশ রূপান্তর : রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে সহিংসতা এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের খবরে উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘের অধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ক্লেমেন্ট ভউল বলেছেন, বাংলাদেশের ঘটনাগুলোর ওপর বিশেষ নজর রাখছেন তারা। এদিকে, গণমাধ্যম ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকারের কথা বাংলাদেশকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি উইন লুইস।
এম হুমায়ুন কবির : জাতিসংঘের এই প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ঢাকায় ১৫টি দূতাবাসের একটি যৌথ প্রতিক্রিয়াও আমরা দেখেছি। এছাড়া ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসও সভা-সমাবেশের অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে, এই বিষয়গুলো আমরা যেভাবে দেখছি তা না করে বিষয়গুলো একটু ভিন্নভাবেও ভাবার সুযোগ আছে। তার কারণ হলো, জাতিসংঘ বা পশ্চিমা পনেরো দেশের দূতাবাস যখন সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে তাতে প্রতীয়মান হয় যে তারা বিষয়গুলোকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। ফলে আমার মনে হয় যে, সরকারেরও উচিত বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।
এটা মনে রাখতে হবে যে, আমরাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশ। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা রাষ্ট্রসমূহের বহুপক্ষীয় উদ্যোগে ভূমিকা রাখছি এবং আগামীতে এই ভূমিকা আরও জোরদার করার সুযোগ আছে। আমরা মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মেনে নিয়েছি, আমরা ছেষট্টি সালের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস সমর্থন করেছি, আমরা ইকোনমিক সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটসগুলো সমর্থন করেছি। এছাড়া নিজেদের সংবিধানেই আমরা মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা প্রদানের কথা বলেছি। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং গণতান্ত্রিক যে প্রক্রিয়া সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেসব সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিও আমাদের আন্তরিক থাকা দরকার।
দেশ রূপান্তর : জনপরিসরের আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের ওপর বড় প্রতিবেশী ভারত এবং বৈশি^ক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাবের কথা আলোচিত হতে দেখি। এছাড়া সাম্প্রতিককালে পশ্চিমাদের সঙ্গে টানাপড়েনের পাশাপাশি প্রাচ্যমুখী নীতির কথাও শুনেছি। কিন্তু এবার আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘সর্বশেষ নির্বাচনের আগের রাতে পুলিশের ব্যালটবাক্স ভর্তি করা’ সংক্রান্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতি নাওকির বক্তব্য নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন-সহযোগী জাপানের এমন বক্তব্য আগে দেখা যায়নি। এই বিষয়গুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?
এম হুমায়ুন কবির : এটা বুঝতে হবে যে, আমাদের বন্ধুরা আমাদের কীভাবে দেখছে তার প্রধান নিয়ামক আমরা নিজেরাই। আমরা নিজেরা যদি নিজেদের সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করে ফেলতে পারি তাহলে অন্য কারোর কোনো মন্তব্য করার বা কোনো কথা বলার সুযোগই থাকে না। এমন না হওয়ার কারণেই কখনো কখনো আমাদের কথা শুনতে হয়। এটা কোনো দেশের জন্যই সম্মানজনক নয়।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু আমরা একদিকে যেমন নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে পারছি না অন্যদিকে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তা ক্ষমতাসীনই হোক কিংবা বিরোধীই হোক বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া, রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে দেখি। এসব বিষয় জনগণের মনেও নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। যেমন, গত বছর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সম্পর্কে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূতের মূল্যায়ন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বিএনপিকে।
এম হুমায়ুন কবির : এসব খুবই দুঃখজনক। এখানে দুটো বিষয়, বিভিন্ন দেশের যারা এসব কথা বলেন তাদেরও এক্ষেত্রে সংযত থাকা উচিত আর দেশের যারা এসব নিয়ে সমালোচনা করেন তাদেরও সংযত থাকা উচিত। আরেকটা বিষয় আমাদের খেয়াল করা দরকার, সেটা হলো, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সংকট। এক দশক আগেও আমরা সেভাবে এই সংকটে ছিলাম না। কিন্তু রোহিঙ্গা-সংকট যখন থেকে তীব্র আকার ধারণ করেছে তখন থেকেই বাংলাদেশ একটা নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটে প্রবেশ করেছে। গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এখনই বাংলাদেশ এমন ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে রয়েছে। একইসঙ্গে এখন এশিয়া অঞ্চলেও যেহেতু একটা বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তার প্রেক্ষাপটেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই প্রেক্ষাপটে কেউ আমাদের পক্ষে কথা বলতে পারে, পক্ষে কাজ করতে পারে আবার কোনো কোনো পক্ষ আমাদের স্বার্থের প্রতিকূলে থাকতে পারে। ফলে আমাদের দিক থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে আমরা কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়ে না যাই। এই বিষয়গুলোতে সবার, বিশেষ করে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদেরই সচেতন থাকতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং এশিয়ার পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটের কথা বলছিলেন। একইসঙ্গে আমরা দেখছি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়েই একটা নতুন মেরুকরণের আভাস-ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে কি না এবং এক্ষেত্রে আমাদের কী ধরনের অবস্থান নেওয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন?
এম হুমায়ুন কবির : আমরা চেষ্টা করছি এক ধরনের সহাবস্থান এবং সম-দূরত্বের নীতি নিয়ে নিরপেক্ষ থাকার। কিন্তু এই কাজটা সহজ নয়। বিশ্বপরিস্থিতি যেহেতু দ্রুত পরিবর্তনশীল তাই কূটনৈতিকভাবে আমাদের আরও কৌশলী হতে হবে এবং আরও বেশি কূটনৈতিক দক্ষতা অর্জনের দিকে যেতে হবে। আর বাংলাদেশের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং বিশ্বপরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আমাদের অভ্যন্তরীণ সংহতি দৃঢ় করা। কারণ অভ্যন্তরীণ বিভাজন অন্যের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। জাতি হিসেবে আমরা এখন একটা ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যেখানে বাংলাদেশকে এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন দুটোর সঙ্গেই খাপ খাওয়াতে হবে। ফলে আমাদের পূর্বতন অনেক ধারণা বদলাতে হবে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সংহতি ও কূটনৈতিক সক্ষমতা দুটোই জোরদার করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
এম হুমায়ুন কবির : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ
