মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না আওয়ামী লীগ : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:২৬ এএম

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, তার দল আওয়ামী লীগ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না, সুরক্ষা দেয়। আওয়ামী লীগ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার জন্য কয়েকটি দেশের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তার সরকারের বারবার আবেদন সত্ত্বেও কিছু দেশ খুনিদের ফেরত না দিয়ে তাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামরিক স্বৈরশাসক ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সারা দেশে বিভিন্ন কারাগারে ও ঢাকা সেনানিবাসের ফায়ারিং গ্রাউন্ডে সশস্ত্র বাহিনীর শত শত কর্মকর্তা ও সৈন্যদের হত্যার পাশাপাশি অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গুম ও হত্যা সংস্কৃতির সূচনা করেছিল।

নিহতদের স্বজনরা এখনো তাদের কাছের এবং প্রিয়জনের লাশ পায়নি উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিএনপি এখন কোন মুখে গুম-খুনের কথা বলছে।

প্রধানমন্ত্রী বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এবং এ দিনে বিএনপির কোনো কর্মসূচি না থাকার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যারা সেই দিন এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে ডাক্তার, সাংবাদিকসহ দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল সেই নিজামী থেকে শুরু করে যাদের আমরা বিচার করেছি এবং বিচারের রায়ও কার্যকর করেছি এদেরই তো খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসিয়েছিল। এদেরই তো মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়েছিল জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতা বিরোধীদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানানোর পর এরশাদ এসে আরও এক ধাপ উপরে উপদেষ্টা অথবা প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যান্ডিডেটও বানাল, রাজনীতি করার সুযোগ দিল জাতির পিতার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিকে, সেই ফারুককে।

তিনি বলেন, ‘খুনি রশিদ যে আমার সেজ ফুপুর বাড়িতে গিয়ে ৪ বছরের সুকান্ত থেকে শুরু করে আমার ফুপুকে গুলি করেছে, ফুফাকেও হত্যা করেছে, তিনজন ফুপাতো বোনকে হত্যা করেছে, ভাইকে হত্যা করেছে, সে এখন আমেরিকায়। বারবার তাদের কাছে আমরা অনুরোধ করছি ওই আসামিকে আমাদের কাছে ফেরত দেন, সে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, সেই সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে তারা দেয় না। কারণ খুনির মানবাধিকার রক্ষা করছে তারা। অর্থ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীর মানবাধিকার রক্ষা করছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর মেজর নূর যে সরাসরি ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়েছিল সেই নূর এখন কানাডায়। কানাডা সরকারকে বারবার অনুরোধ করি তারা ফেরত দেয় না। খুনিদের মানবাধিকার রক্ষা করতে তারা ব্যস্ত। তাহলে আমরা যারা আপনজন ও স্বজন হারিয়েছি তাদের অপরাধটা কী? সেটা আমি জাতির কাছে জিজ্ঞাসা করি। বিএনপি বা জামায়াত যারা এদের জন্য হাপিত্যেশ করে কান্নাকাটি করে, তারা এর জবাব দিক।’

তিনি বলেন, ‘শুধু এখানে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। কত মানুষকে গুম করেছে। আমার ছাত্রলীগের মাহফুজ বাবুর লাশ তো তার পরিবার পায়নি। নারায়ণগঞ্জের মনিরের লাশ তো পায়নি। যুবলীগ নেতা চট্টগ্রামে মৌলভী সৈয়দকে দিনের পর দিন অত্যাচার করে মেরেছে, ঠিক সেইভাবে খসরুসহ আমাদের বহু নেতাকে দিনের পর দিন অত্যাচার করেছে। একেকজনকে অত্যাচার করে এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছে বেশি দিন তারা আর বাঁচতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘এই বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং আওয়ামী লীগকে একদম নিশ্চিহ্ন করার অপরাধ তারা করেছে। এদেশের স্বাধীনতা আমরা এনেছি। জাতির পিতা যদি স্বাধীনতা না আনতেন তাহলে ওই মেজর জিয়া কি কোনোদিন মেজর জেনারেল হতে পারত বা তার পরিবার সেই স্ট্যাটাস ভোগ করতে পারত, পারত না। ওই মেজর থেকেই স্যালুট দিতে দিতে ওই বুট ও পা ক্ষয় হয়ে শেষ হয়ে যেত।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। যারা আপনজন হারিয়েছে তারা জানে যে তারা কী হারিয়েছে। তারাও তো লাশ পায়নি। আর যারা পেয়েছে তাও গলিত লাশ, দেখার মতো নয়।’

আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রারম্ভিক বক্তৃতা করেন। আরও বক্তৃতা করেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ও আবদুর রহমান; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম; সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক শহীদ জায়া ডা. রোকেয়া সুলতানা এবং মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি ও হুমায়ুন কবির।

দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এবং উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সভাটি সঞ্চালনা করেন। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ সিনিয়র নেতারা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীন জাতিকে মেধাশূন্য করতেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল। সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সংবিধান ও সেনা আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে পুনর্বাসিত করে। সেদিন যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল সেই যুদ্ধাপরাধীদের আমরা বিচার করেছি, অনেকের রায়ও কার্যকর হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু জানে বেঁচে থাকাটাই তো মানবাধিকার নয়, আজকে আমরা খাদ্যোৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। মানুষকে আমরা বিনে পয়সাতেও খাবার দিচ্ছি, স্বল্পমূল্যে দিচ্ছি, অনেক উন্নত দেশও যেটা পারেনি আমরা বিনে পয়সায় করোনার ভ্যাকসিন দিয়েছি, সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে বিনে পয়সায় ওষুধ দিচ্ছি। সারা দেশে পুল, ব্রিজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করে সরাসরি যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছি।’

তার সরকার গৃহহীন-ভূমিহীনদের বিনামূলে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে উল্লেখ করে দৃঢ়কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, মুজিবের বাংলায় একজনও যেন গৃহহীন না থাকে সে ব্যবস্থা তার সরকার করবে।

আমরা দেশের কী সর্বনাশ করলাম এ প্রশ্ন রেখে সমালোচকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘোষণা করলাম। তখন সংসদে তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া ও সাইফুর রহমান বলেছিলেন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ভালো নয়, তাহলে বিদেশ থেকে খাদ্য সাহায্য পাওয়া যাবে না। মানে আমাদের বিদেশিদের কাছে ভিক্ষা নিয়ে চলতে হবে!’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব কারণেই আমাদের উন্নয়ন তাদের (বিএনপি) চোখে পড়ে না। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি, যার সুবিধা সবাই ভোগ করছেন। বাংলাদেশ এত দ্রুত আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কেন? এটাই তাদের বড় কষ্ট। কারণ তারা দুর্নীতি করে লুটে খেতে পারছে না।’

প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অর্থায়ন প্রত্যাহারের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম। কানাডার আদালত রায় দিয়ে বলেছে, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সব অভিযোগ ভুয়া।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের গণহত্যা এবং সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের শহীদ বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত