মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর পুরান ঢাকায় সকাল থেকেই লাল-সবুজ রঙের ছড়াছড়ি। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের অনেক মানুষ যোগ দিয়েছেন বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে। পরিবার-পরিজন ও পছন্দের মানুষকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছেন তারা। শহরজুড়ে বিজয়ের উৎসব।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে পথশিশু ও নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে। বিজয়ের দিনটি তাদের কাছে আর সাতটা দিনের মতোই মলিন আর বিবর্ণ। তাদের কাছে বিজয় দিবস মানে উৎসব মুখরতা নয়। দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা ও ক্ষুধামুক্ত থাকাটাই তাদের বিজয়ের বড় আনন্দ!
পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে কথা হয় কুলি, মুচি, মাঝি, রিকশাচালক, চা, পান, সিগারেট বিক্রেতাসহ বেশ কয়েকজন নিম্নআয়ের মানুষ ও পথশিশুর সঙ্গে। দিন এনে দিন খাওয়া এসব নিম্নআয়ের মানুষ বিজয় উৎসব বলতে বোঝেন ‘দুমুঠো ডাল-ভাত পরিবারে সদস্যদের মুখে তুলে দেওয়া’। আর পথশিশুরা ক্ষুধামুক্ত থাকাকেই তাদের ‘বিজয়ের আনন্দ’ মনে করে।
বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকার ভবঘুরে মরিয়ম আক্তার (৬) জানায়, সকাল থেকেই পার্কে লাল-সবুজ রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে। কিন্তু কেন, তা মরিয়মের জানা নেই। সকালে খাবার জোটেনি। দুপুরে খাবার খেতে পাবে কিনা তাও সে জানে না।
বিজয় দিবস সম্পর্কে জানা নেই মরিয়মের বড় ভাই বেলালেরও (১১)। সে জানায়, ‘মা মারা যাওয়ারপর বাবা নতুন বিয়ে করে। নতুন মা খেতে দেয় না তাই ভাই-বোন মিলে শাঁখারি বাজার এলাকার ওভারব্রিজের ওপর থাকি। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পাই তা দিয়েই আমাদের ভাই-বোনের খেয়ে না খেয়ে দিন চলে যায়’।
মারুফ (৮) নামে আরেক ভবঘুরে জানায়, ‘বিজয় দিবস কী জানি না। কোনো দিন একবেলা ভালো-মন্দ খাইতে পারলেই মনে শান্তি। সকালে এক ভাই একটা রুটি কিনা দিছিল। দুপুর থেকে এখনো না খেয়ে আছি’।
পুরান ঢাকা এলাকার রিকশাচালক জালাল উদ্দিন (৪৫) বলেন, ‘আজ বিজয়ের দিন। সবাই পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। কিন্তু আমার সেই সুযোগ নাই। আমি বসে থাকলে তো আমার ছেলেমেয়েরা না খেয়ে থাকবে।গতরাতে শহীদ মিনারের সামনে থেকে ২০ টাকা দিয়ে একটা পতাকা কিনছি। আজ সকালে রিকশার সামনে পতাকা রেখে রিকশা বের করছি’।
বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকার চা বিক্রেতা একরামুল হক (৩৭) বলেন, ‘সকাল থেকে শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা অনেক মানুষ পার্কে আসছে। সবার মনে বিজয়ের আনন্দ। পরিবার গ্রামে থাকে। ওদের মুখে দু মুঠ ডাল-ভাত যদি তুলে দিতে পারি এই আমার আনন্দ’।
সদরঘাট এলাকার মাঝি শরিফুল (৩০) বলেন, ‘বাজারে জিনিসপত্রে যে দাম, তাতে সংসার চালানো খুব কঠিন। সারা দিন নৌকা চালায়া যা পাই সব বাজার করতেই শেষ হয়ে যায়। আমিও নিজের দেশরে ভালোবাসি’।
সরকারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর অনুরোধ জানান তিনি।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক হামিদুল হক বলেন, ‘বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, হারিয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুরা সাধারণত পথশিশুতে পরিণত হয়। দারিদ্র্যের কারণে এসব শিশু খাদ্য, চিকিৎসাসহ সব ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। সরকারের পাশাপাশি নানা বেসরকারি সংস্থা এসব শিশুদের নিয়ে কাজ করে আসছে। পথশিশুদের নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এ শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে’।
