বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূরের মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও র্যাবের কাছ থেকে সন্তোষজনক বক্তব্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার সহপাঠীরা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা এ কথা জানান। একই সঙ্গে ফারদিনের মৃত্যু নিয়ে কর্মসূচি আপাতত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
তারা বলেন, ফারদিনের মৃত্যু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে যে প্রশ্নগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল, ডিবি ও র্যাব প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে সেগুলোর মোটামুটি সন্তোষজনক উত্তর মিলেছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, তারা সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাই ধারণা করেছিলেন ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে। গত এক মাস ধরে যেসব তথ্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল তার ভিত্তিতে এ ধারণা আরও বেগবান হয়। গত বুধবার ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় ফারদিন আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। এটা মেনে না নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরের দিনই প্রতিবাদ সভা করার ঘোষণা দেন। পরে ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার জন্য সেই প্রতিবাদ সভা স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর ডিবি এবং র্যাবের কার্যালয়ে গিয়ে মোটামুটি ৫টি প্রধান প্রশ্নের উত্তর জানতে চান শিক্ষার্থীরা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা জানান, ডিবির কাছে তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, ফারদিনের বুকে ও মাথায় অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাহলে এখন কীভাবে আত্মহত্যার বিষয়টি এলো? উত্তরে ডিবি তাদের জানায়, চিকিৎসকের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। চিকিৎসক তাদের বলেছেন, এই আঘাতের ধরনটা অনেকটা কিল-ঘুষির মতো। এখানে কোনো কাটাছেঁড়ার বিষয় ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা ছিল রক্ত জমাট বাঁধার মতো। জামা কাপড় ছিঁড়ে যায়নি। চিকিৎসক বলেন, ওপর থেকে কেউ যদি নদীতে লাফ দেয়, তখন স্রোতের কারণে স্প্যানে ধাক্কা খেয়ে কিংবা পানিতে লাফ দেওয়ার কারণেও এ ধরনের আঘাতের চিহ্ন আসতে পারে। সুতরাং ওই চিহ্নের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক বলছেন যে, এটা যে আত্মহত্যা নয়, তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না।
ডিবির কাছে দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ডিবি যে দাবি করছিল, সেই লোকটিই যে ফারদিন, এর ভিত্তি কোথায়? জবাবে ডিবি জানায়, সর্বশেষ ফারদিনকে যাত্রাবাড়ী থেকে লেগুনায় উঠতে দেখা যায়। সেই লেগুনা তাকে তারাবোর দিকে অর্থাৎ সুলতানা কামাল ব্রিজের উল্টো পাশে নামিয়ে দেয়। ফারদিনের এবং ওই লেগুনা চালকের অবস্থান এগুলো ক্রসচেক করে ডিবি প্রমাণ পেয়েছে যে, বিষয়টি সত্য। ফারদিন যে জায়গা থেকে লাফ দেন, সেই জায়গা থেকেই তার লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। ডিবি মনে করছে, ওই একই সময়ে, একই জায়গা থেকে অন্য একজনের লাফ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এছাড়া, ওই সময়ের পরই ফারদিনের মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। এর ১৫-২০ মিনিট পর ফারদিনের হাতঘড়িও বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, ফারদিন যে সেদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে কি না? ডিবি জানায়, ওই দিন রাত ১০টা ৪৫ থেকে ১১টা ৯ মিনিট পর্যন্ত বুয়েটের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফারদিনের কথা হয়। সেই কথোপকথনের সময় ফারদিনকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। ট্র্যাক করা তথ্য বলছে, ওই সময় ফারদিন ছিলেন জনসন রোডে। অর্থাৎ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর যে ট্র্যাকটা ডিবি দেখেছে, ওই সময়টার মধ্যেই সেটি ছিল। ঘুরতে ঘুরতেই সে ফোনে কথা বলেছে এবং কথার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। এরপর ১টা ৫৭ থেকে ১টা ৫৯ পর্যন্ত তার একজন বন্ধুর সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা হয়। সেই বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন দেখে সেখানেও অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের চতুর্থ প্রশ্ন ছিল, লেগুনা চালক কতদিন আগে ফারদিনকে নামিয়ে দিয়েছিল, তা সে কীভাবে মনে রেখেছে? উত্তরে ডিবি জানায়, ওই লেগুনা চালককে আটকের আগে পুলিশ নজরদারির মধ্যে রেখেছিল। প্রথমত, তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, আটকের পর লেগুনা চালক ঠিক কতজন নিয়ে যাত্রা করেছিল, সে ব্যাপারে হুবহু কিছু বলতে পারেনি। কারণ ঘটনা অনেকদিন আগের। তবে সে বলেছে, মোটামুটি ৫/৬ জন ছিল। তারাবোর ওইখানে, অর্থাৎ ব্রিজের ওই পাড়ে বাজারের কাছে অল্প দূরত্বের দুটো ভিন্ন স্থানে দুজনকে নামিয়ে দেয়। ডিবির ধারণা, ওই দুজনের একজন ফারদিন। এ কারণে লেগুনা চালকের সাক্ষ্যকে তারা খুব বেশি একটা সন্দেহ করছেন না। লেগুনা চালকের কথার সঙ্গে সময় পুরোপুরি মিলে গেছে।
ডিবির কাছে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের পর মাদক, চনপাড়া বস্তিসহ বিভিন্ন ঘটনা যে সামনে এলো, এগুলোর ভিত্তি কী? এমন প্রশ্নের প্রস্তুতি ছিল বুয়েট শিক্ষার্থীদের। কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে ডিবি থেকে আগে কিছু জানানো হয়নি। তাই প্রশ্নটি করার সুযোগ পাননি তারা। পরে একই প্রশ্ন র্যাবের কাছে করেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। জবাবে র্যাব জানায়, তারা যখন প্রথম তদন্ত করা শুরু করে, তখন ৩টি জায়গা থেকে তদন্ত শুরু করে। ১. পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না ২. দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কি না ৩. আত্মহত্যা কি না। তদন্ত শুরুর পর ফারদিনের রবি সিমের নম্বর ট্র্যাক করে এমন একটি সেলে তার লোকেশন কানেক্ট হয়ে যায়, যা মূলত চনপাড়ার বেশিরভাগ এলাকা এবং সুলতানা কামাল ব্রিজের অংশবিশেষ কাভার করে। ওইসব ভিত্তিতে র্যাব চনপাড়া এলাকা টার্গেট করে। ওই সময়, চনপাড়ার অনেক সন্ত্রাসী দাবি করে, তারা ফারদিনকে হত্যা করেছে। সেই জায়গা থেকে র্যাব তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেক্ষেত্রে র্যাব তদন্ত করে কিছু না পেলে, সুলতানা কামাল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার দিকে ফোকাস করে।
শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, আপাতত ফারদিনের মৃত্যুর বিষয়ে তাদের আর কোনো কর্মসূচি নেই। তবে ফারদিনের পরিবার যদি যৌক্তিক কোনোকিছু দাবি করে তারা তাদের পাশে দাঁড়াবে। এখন তাদের (শিক্ষার্থীরা) কাছে ফারদিনের মৃত্যুর বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন করার মতো কোনো উপাদান নেই। তবে ভবিষ্যতে যদি নতুন করে কোনো তথ্য আসে তখন বিষয়টি নিয়ে আবার কথা বলবেন তারা।
